শিল্পমন্ত্রীর পিএস সিন্ডিকেটের দুর্নীতি

ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে বিএসইসি ও বিএসসিআইসি

news paper

আব্দুল লতিফ রানা

প্রকাশিত: ৯-৭-২০২৩ দুপুর ৩:২৬

42Views

বাংলাদেশ কেমিক্যাল কর্পোরেশন এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন একজন মন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) এর নেতৃত্বে গড়ে উঠা সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। আর এই সিন্ডিকের অন্যতম হচ্ছেন যুগ্ম সচিব মো. আব্দুল ওয়াহেদ।

সচেতন মহল বলছেন, বাংলাদেশ সরকার তথা প্রধামন্ত্রীর ‘স্মাট রাষ্ট্র’ গড়তে দেশের বিভিন্ন এলাকায় কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ বরাদ্ধ করা হচ্ছে। অথচ এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মর্কতাদের দুর্নীতির কারণে প্রধানমন্ত্রীর সেই মহৎ উদ্যেগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এসব দুর্নীতির বিষয়ে বিসিআইসি এবং বিসিক কর্পোরেশনের কর্মচারী-কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভেযোগ করা হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে দুদকের পক্ষ থেকে তদন্তের প্রক্রিয়া শুরু করা হচ্ছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

সুত্র জানায়, পিএস মো. আব্দুল ওয়াহেদ এর সিন্ডিকেটের দুর্নীতির বিষয়ে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক-৪ গুলশান আরা স্বাক্ষরিত এক পত্রে যার স্মারক ০৩.০০.২৬৯০.০৭১.১৮.০০১. ২০২২-১৮ নং এর মাধ্যমে শিল্পমন্ত্রণালয়ের সচিব এর দপ্তরে পাঠানো হয়। ওই পত্রে বলা হয়েছে, প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তৌহিদুজ্জামান এর বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় প্রাপ্ত অভিযোগ (সংলগ্নীসহ) নির্দেশ ক্রমে প্রেরণ করা হয়েছে। তার দুর্নীতি অনিয়ম এর বিষয়ে বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে অত্র কার্যালয়ে অবহিত করার জন্য অনুরোধ করা হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, যুগ্ম সচিব মো. আব্দুল ওয়াহেদ গত ১৩-০২-২০২৩ ইং হতে ১২-০৫-২৩ ইং পর্যন্ত সরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠান প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। এ সময়ে তার বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকাণ্ড ছাড়াও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে অসদাচরণ করার অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগিরা বলছেন, তিনি এমডি হওয়ার পর কতিপয় বিতর্কিত এজেন্ডা যা প্রগতির জন্য ক্ষতিকর, তা বোর্ডে উত্থাপিত করা হলেও পাশ করতে বাধা প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে দুর্নীতির বিষয়টি প্রকাশিত হলে মন্ত্রণালয় তাকে প্রত্যাহার করে নেয়। এরপর তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে তার সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য অ্যাকাউন্টেন্ড মো. আজাদ (নন টেকনিশিয়ান) কে মোটা অংকের উৎকোচের বিনিময়ে প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজের মতো একটি ব্র্যান্ড কোম্পানির এমডি হিসেবে নিয়োগ করেন। অথচ মো. আজাদ এর উর্ধ্বতন আরো প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জন ডিজিএম ও জিএম এর মত ইঞ্জিনিয়ার সেক্টরের কর্মকর্তা রয়েছেন। তারপরও তাকে অবৈধভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আর একই পদে আরো কজেকজন কর্তকর্তা থাকার পরও তাদের কাউকে নিয়োগ  দেওয়া হয়নি। মন্ত্রণালয়ের সচিবকে ভুল তথ্য দিয়ে তাকে নিয়োগ করা হয়েছে। তিনি নিয়োগ পাওয়ার পর প্রথম বোর্ড মিটিংয়ে আগের সেই বিতর্কিত এজেন্ডা পুনরায় উত্থাপিত করেন। 

প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ এর সাবেক পরিচালক মো. জসিম উদ্দিন রাজীব অভিযোগ করে বলেন, বোর্ড সভায় সেই এজেন্ডা উত্থাপিত করা হলে আমি তার বিরোধিতা করি। এক্ষেত্রে যুগ্ম সচিব আব্দুল ওয়াহেদ তাদের দুর্নীতির কাজে বাধাগ্রস্ত হন। পরবর্তীতে তার সিন্ডিকেটের বিতর্কিত ঠিকাদার ব্যবসায়ী ‘আরাফাত’ তাদের কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে জানানো হয়, তার বিরোধিতার কারণে তাদের অনেক ক্ষতি হয়েছে। যে এজেন্ডাগুলো পাশ করাতে উৎকোচ গ্রহণ করেছেন। এ জন্য মো. জসিম উদ্দিন রাজিবের কাছে ২০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। আর তাদের দাবিকৃত টাকা না দিলে তার ডিরেক্টর পদ বা প্রগতি ইন্ডাস্ট্রির এর পদ হতে অপসারণ করার হুমকি দেন। মন্ত্রণালয়ের সচিব ও চেয়ারম্যান (স্থপতি করপোরেশন) এর জন্য ওই ২০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। আর দাবিকৃত উৎকোচ দিতে রাজি না হওয়ায় প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক পদ হতে মো. জসিম উদ্দিন রাজিব কে অপসারণ করা হয়। ফলে তিনি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এ অভিযোগ সহ আইনি লড়াই করে যাবেন বলে সকালের সময়কে জানিয়েছেন তিনি। 

তিনি আরো বলেন, মন্ত্রণালয়ের সচিব ও চেয়ারম্যান সম্ভবত কোম্পানির আইন সম্পর্কে ভালোভাবে ধারণা নেই। যদি থাকতো তাহলে অবৈধভাবে তাকে অপসারণ করতেন না। অপরদিকে যুগ্ম সচিব মো. আব্দুল ওয়াহেদ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের লোক দিয়ে ‘সাইজ করা হবে’ বলে তাকে হুমকি দিয়ে আসছেন। আবার বর্তমান প্রগতির এমডি আবুল কালাম আজাদ এর বাড়ি পাবনা জেলায় এবং রাষ্ট্রপতির এলাকার হওয়ায় তিনিও তাকে হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন। তিনি যুদ্ধপরাধ মামলার ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামীর আত্মীয় বলে প্রগতির কর্মচারী-কর্মকর্তাগণ জানিয়েছেন। 

আরেক সূত্র জানায়, মো. আবদুল ওয়াহেদ তার ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রভাব খাটিয়ে উপসচিব ও মন্ত্রীর পিএস পদে থাকা অবস্থায় সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে প্রগতির তৎকালীন ৯৪ (চুরানব্বই) লাখ টাকা মূল্যের একটি নতুন পাজেরো স্পোর্ট জিপ, যাহার চেসিস নং ১৮০০২২০, প্রগতির গ্যারেজ নং ১৪৮/শ (গাড়িটি কারখানায় সংযোজনের পর বিক্রয়ের জন্য ঢাকা অফিসে পাঠানো হয়েছিল) গাড়িটি কয়েক বছর ধরে ব্যবহার করে বিক্রয়ের অযোগ্য করা হয়েছে। এরপর উক্ত গাড়িটি পরিবর্তন করে প্রগতির ফ্লিটের আরো একটি পাজেরো স্পোর্ট কিউএক্স জিপ, যাহার চেসিস নং ১১০০০০১, রেজিস্ট্রেশন নং ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৮-১৫৮১ ব্যবহার করে আসছেন। তিনি প্রায় ১ কোটি টাকা মূল্যের একটি পাজেরো স্পোর্ট জিপ (প্রগতির ড্রাইভার, জ্বালানি, মেইন্টেনেন্সসহ) ব্যবহার করে আসছেন। তিনি শিল্প মন্ত্রণালয়ে যোগদানের পর হতে প্রগতির গাড়ি, ড্রাইভার, ফুয়েলসহ প্রায় সাড়ে ৫ বছর ধরে ব্যবহার করে আসছেন। এতে গাড়ির ড্রাইভারের বেতন-ভাতা, ওভার টাইম, ফুয়েল ও মেইনটেনেন্স বাবদ লাখ লাখ টাকা প্রগতির অনুৎপাদনশীল খাতে অপব্যয় করে আসছেন। ফলে প্রগতি বিপুল অংকের আর্থিক ক্ষতি সাধিত হচ্ছে। অপরদিকে শুধু তিনি একা নন, তার শক্তিশালী সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বাংলাদেশ ব্লেড ফ্যাক্টরি মো. তৌহিদুজ্জামানের বিরুদ্ধে জালিয়াতির মাধ্যমে চাকরি নেয়া এবং দুর্নীতি অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করা হলেও তার বিরুদ্ধে তেমন কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।

অপরদিকে প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ এর অস্থায়ী চেয়ারম্যান হিসেবে অতিরিক্ত সচিব এস আলম ৩ থেকে ৪ মাস দায়িত্ব পালন করেন। তাকে একটি দেড় কোটি টাকা মূল্যের গাড়ি ৮০ লাখ টাকায় বিক্রি দেখিয়ে দেয়া হয়। অথচ প্রগতির অর্গানোগ্রামে কোন জিপ গাড়ি কেনার বিধান নেই বলে জানা গেছে। তারপর আবার বোর্ড সভায় পাশ না করিয়ে উক্ত গাড়িটি ক্রয় দেখিয়ে তাকে দেওয়া হয়েছে। যা এখনো তিনি ব্যবহার করছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে।  

শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত বছরের ৩ জানুয়ারি মন্ত্রণালয়ের স্মারক নম্বর ০৫,০০,০০০০,১৮০,২৭.০০১.২২.১৬ মতে অত্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. নুরুল হক স্বাক্ষরিত পত্রে বলা হয়েছে, মো. তৌহিদুজ্জামান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বাংলাদেশ ব্লেড ফ্যাক্টরি-এর বিরুদ্ধে মো. জসিম উদ্দিন রাজিব, পরিচালক, পিআইএল কোম্পানী বোর্ড-এর অভিযোগের বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এর শৃঙ্খলা-১ শাখায় জানানো হয় যে, মো. তৌহিদুজ্জামান-এর বিরুদ্ধে বিধি লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লি. এ অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে নিয়োগ প্রাপ্তি ও মহাব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি লাভ, বিধি বহির্ভূতভাবে একইসাথে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রগতি টাওয়ার প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালন, প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ, প্রাপ্যতার অতিরিক্ত গাড়ি ও গাড়ির জ্বালানি ব্যবহার, ক্রয়কার্যে দুর্নীতি এবং ঘুষের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্লেড ফ্যাক্টরি লি. এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসাবে বদলি হওয়ার অভিযোগ আনা হয়। অত্র পত্রে আরো বলা হয়েছে, এ অবস্থায়, মো. তৌহিদুজ্জামান, প্রাক্তন ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রগতি ইন্ডাম্ব্রিজ লি. বর্তমানে ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বাংলাদেশ ব্লেড ফ্যাক্টরী লি. এর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি বলে জানা গেছে। 

এছাড়া, সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য প্রগতি ইন্ডাষ্টিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তৌহিদুজ্জামান এর দুর্নীতি অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ গোপন রাখার চেষ্টা করছেন মো. ওয়াহিদ উদ্দিন চৌধুরী। তিনি যে পদে চাকরি করছেন, সেই পদে আবেদন না করেই অন্য পদে চাকরির আবেদন করেছিলেন। কিন্তু শক্তিশালী সিন্ডিকেটের দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি চাকরি করছেন। 

প্রগতি ইন্ডাষ্ট্রিজ লিমিটেড এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তৌহিজ্জামান এর বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হতে বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গহণ পূর্বক অত্র কার্যালয়ে অবহিত করার জন্য অনুরোধ করা হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে তেমন কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে শিল্পমন্ত্রীর পিএস মো. আব্দুল ওয়াহেদ এর সেল ফোনে ফোন করা হলে তিনি ফোনটি রিসিভ করে কথা না বলেই তা কেটে দেন। এরপর একাধিকবার কল করা হলেও তার ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।

 


আরও পড়ুন