লাইসেন্সকৃত অস্ত্র অবৈধ ব্যবহার রোধে ডাটাবেইজ করছে সিআইডি

news paper

আব্দুল লতিফ রানা

প্রকাশিত: ২-৪-২০২৩ বিকাল ৫:১৪

78Views

লাইসেন্সকৃত আগ্নেয়াস্ত্র ছিনতাই, টেন্ডারবাজীসহ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ব্যবহার করা হচ্ছে। নগরীর বেশ কয়েকটি চাঁদাবাজী ও খুনের ঘটনায় এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরে গত ১০ বছরে সারাদেশ থেকে বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে প্রায় ৫ হাজার অভিযোগ জমা পড়ে। এ সময়ে ৫ শতাধিক বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রধারীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হয়েছে।

এদিকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার রোধে নিয়মিত “গানচেকিং” করতে পুলিশ কর্মকর্তাদের সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন।বৃহস্পতিবার রাজধানীতে গত ফেব্রুয়ারি মাসের অপরাধ পর্যালোচনা ও সাম্প্রতিক ইস্যুতে তিনি এসব কথা বলেন। আর রমজান ও ঈদ উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও অপরাধ দমনে জোরালো কার্যক্রম গ্রহণে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন আইজিপি।

জানা গেছে, শুধু রাজধানীই নয়, সারাদেশে খুন, ছিনতাই, ডাকাতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজিসহ অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ছাড়াও বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের অবৈধ ব্যবহারের ঘটনা ঘটছে। এই বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার বন্ধে কঠোর অবস্থানে পুলিশ। তারই অংশ হিসেবে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) গত ২০২১ সালে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার বন্ধে দেশের সকল আগ্নেয়াস্ত্রের ডাটাবেইজ তৈরির কাজ হাতে নিয়েছে। জানা গেছে, অনেক প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীই বৈধ অস্ত্রের ব্যবহারে নীতিমালার তোয়াক্কা করছে না। তারা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা, আধিপত্য বিস্তার, পূর্বশত্রুতা, জমিজমার বিরোধ, ছিনতাই, ডাকাতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজিসহ অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহারের অভিযোগ বাড়ছে। 

আবার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, ঠিকাদারসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার যেসব মানুষের আত্মরক্ষার্থে যে সব বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে, তা অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি বৈধ অস্ত্র অবৈধভাবে ভাড়া দেয়ার অভিযোগও রয়েছে। তাছাড়া বৈধ অস্ত্রের মাধ্যমে ভয়ভীতি দেখানো, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক সংঘর্ষ এবং খুনেও ব্যবহার করা হচ্ছে। যদিও বৈধ অস্ত্র ব্যবহারের বিভিন্ন নিয়ম রয়েছে। 

সূত্র জানায়, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে ৪৪ হাজার ১০৪টি অস্ত্রের লাইসেন্সের তথ্য সংরক্ষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪০ হাজার ৭৭৭টি অস্ত্রের লাইসেন্স রয়েছে ব্যক্তির নামে। আর আর্থিকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে বাকি ৩ হাজার ৩২৭টি অস্ত্র রয়েছে। এসব অস্ত্রের মধ্যে একনলা ও দোনলা বন্দুক, শটগান, পিস্তল, রিভলবার ও রাইফেল রয়েছে। 

তবে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, দেশে বৈধ অস্ত্র রয়েছে আরো অনেক বেশি। এসব অস্ত্রের লাইসেন্স নেয়ার তালিকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী রয়েছে এগিয়ে। এমনকি একজনের নামে একাধিক অস্ত্রের লাইসেন্সও নেওয়া হয়েছে। আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়ার জন্য কিছু মানদণ্ড রয়েছে। সেগুলো পূরণ হলেই একজন নাগরিক আগ্নেয়াস্ত্রের জন্য আবেদন করতে পারেন। আবেদনকারীর জীবনের বাস্তব ঝুঁকি থাকলে ‘শর্ট ব্যারেল’ আগ্নেয়াস্ত্রের ক্ষেত্রে আবেদনকারীর বয়স ন্যূনতম ৩০ বছর, ‘লং ব্যারেল’ আগ্নেয়াস্ত্রের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ২৫ বছর থেকে ৭০ বছরের নিচে হতে হবে। আবেদনকারীকে অবশ্যই আয়করদাতা হতে হবে এবং বছরে ন্যূনতম ৩ লাখ টাকা আয়কর দিতে হবে। অনুমতি পেলে আবেদনকারী অস্ত্র আমদানি করে আনতে পারে অথবা দেশীয় বৈধ কোনো ডিলারের কাছ থেকে অস্ত্র কিনতে পারবে। আবার কোনো ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুটি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারবেন। অস্ত্রের লাইসেন্স এবং এর কার্যক্রম আগে হাতে-কলমে নিবন্ধন করা হতো। ফলে রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন হলে তাৎক্ষণিক সঠিক তথ্য পাওয়া যেত না। কিন্তু বর্তমানে ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার চালু হওয়ায় কেউ বৈধ অস্ত্র অবৈধভাবে বিক্রি করতে পারে না। আবার কেউ অবৈধ অস্ত্রকে বৈধ বলে দাবি করলে তা-ও যাচাই করা সহজ। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, দেশে প্রায় দুই লাখ বৈধ অস্ত্র রয়েছে। এসব বৈধ অস্ত্রের মালিকদের পরিচয় ডিলারের কাছে সংরক্ষিত নেই। এমন পরিস্থিতিতে অস্ত্রের ডাটাবেইজ তৈরিতে পুলিশ অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) দেশের ৬৪ জেলা থেকে তথ্য সংগ্রহ করছে। সেজন্য দেশের সব জেলার সিআইডির কার্যালয়ে বৈধ অস্ত্রের মালিকরা অস্ত্রের নমুনা দিচ্ছেন। আর প্রতিটি আগ্নেয়াস্ত্রেরই কিছু স্বতন্ত্র কোড নম্বর রয়েছে। ওই কোডেই অস্ত্রের ধরন বলা হয়েছে। নতুন করে কোনো অস্ত্র কিনলে সঙ্গে সঙ্গেই অস্ত্রের কোড সিআইডিকে দেয়ার জন্য নির্দেশনা রয়েছে। 

এদিকে পবিত্র ঈদ উপলক্ষে ছিনতাই, অজ্ঞান পার্টি, মলম পার্টিসহ অন্যান্য অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অপরাধ দমনে নজরদারী জোরদার করতে বলেছেন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি)। আর অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার রোধে নিয়মিত “গানচেকিং” করতে পুলিশ কর্মকর্তাদের আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

গত বৃহস্পতিবার রাজধানীতে ফেব্রুয়ারি মাসের অপরাধ পর্যালোচনা ও সাম্প্রতিক ইস্যুতে তিনি এসব কথা বলেন। রমজান ও ঈদ উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও অপরাধ দমনে জোরালো কার্যক্রম গ্রহণে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন আইজিপি। ঈদ উপলক্ষে ছিনতাই, অজ্ঞান পার্টি, মলম পার্টিসহ অন্যান্য অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা বলেন। 

উল্লেখ্য, ২০০৮ সনের ২৩ মে সন্ধ্যায় পুরনো ঢাকার ২ নম্বর র‌্যাংকিন ইস্টিটের ব্যবসায়ী অপুদের বাসায় সন্ত্রাসীরা চাঁদার দাবিতে অস্ত্রেশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে হামলা চালায়। তখন স্থানীয়রা সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধ করলে এলোপাতাড়ি গুলি করে পালিয়ে যায়। ব্যবসায়ী অপু গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান। তার দুই ভাই গুরুতর আহত হন। স্থানীয় লোকজন ঘটনাস্থল থেকে রবিন নামে এক সন্ত্রাসীকে ধরে গণপিটুনী দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করে। এ ঘটনায় তৎকালীন সূত্রাপুর থানায় সন্ত্রাসী রাসেল, মাহবুব, মুন্না ও রবিনসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়। মামলাটি ডিবি তদন্ত করেন। ডিবি গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ২০০৯ সালের ২৩ জুলাই রংপুরের কাউনিয়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে সন্ত্রাসী রাসেল, মাহবুব আলম ও মুন্নাকে গ্রেফতার করে। পরে ঘটনাস্থলেই ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশের কাছে জানায়, অপু হত্যার ঘটনায় ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র মিরপুর থানার পেছনে কথিত বড় ভাই হাফিজ উদ্দিন টুলুর কাছে। এ তথ্যের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক ডিবির অপর একটি টিম মিরপুরে হাফিজ উদ্দিন ওরফে টুলুর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালায়। এ সময় জার্মানির তৈরী ৩টি অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র, ৩টি কার্তুজ ও ৫৯ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে। উদ্ধারকৃত অস্ত্রগুলো লাইসেন্স করা ছিল।

এদিকে ২০২১ সালের ১ সেপ্টেম্বর মিরপুর দারুস সালাম এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৮টি পিস্তল, গুলি-ম্যাগজিনসহ ৫ অস্ত্র ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করে ডিবি। গ্রেফতারকৃতরা হলেন- আকরুল হোসেন, ইলিয়াস হোসেন, আবদুল আজিম, ফারুক হোসেন ও ফজলুর রহমান। এদের কাছ থেকে ভারতের তৈরি ৮টি পিস্তল, ১৬টি ম্যাগজিন, ৮ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। গ্রেফতারকৃত আকরুল যশোরের চিহ্নিত সন্ত্রাসী। ২০১৪ থেকে ভারতে তৈরি পিস্তল বিক্রি করেছে। আর যারা এসব অস্ত্র কিনেছে তাদের একটি তালিকা ডিবি উদ্ধার করে।

এ বিষয়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ ((সিআইডি) এর জনসংযোগ বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আজাদ রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে, অস্ত্রের লাইন্সেস এর ডাটাবেইজ এর কাজ চলমান রয়েছে বলে জানান তিনি।

 

 


আরও পড়ুন