বাঙালির ‘অমর একুশে’

news paper

সাজেদা হক

প্রকাশিত: ২২-২-২০২৩ বিকাল ৫:২৫

59Views

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আজ। বাঙালির ‘অমর একুশে’। ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশ। ভাষার দাবিতে জেগে ওঠা বাঙালির বুক ঝাঁঝরা করা ফেব্রুয়ারি। মায়ের কোল খালি হওয়ার দিন। বোনের চোখের অশ্রুতে ভেজা শহীদ মিনার। বেদীতে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানানোর এক মহাক্ষণ। বাঙালির অস্তিত্ব আর ঐতিহ্যে ত্যাগের এক অনন্য ইতিহাস ‘অমর একুশে’।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি। সেদিন ঘটে গিয়েছিল বাঙালি জাতির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরদের বুকের  তাজা রক্তের বিনিময়ে আমরা ফিরে পেয়েছি মায়ের ভাষায় সর্বত্র কথা বলার অধিকার। মহান সেইসব ত্যাগীদের স্মরণ করার প্রথম প্রহর ‘২১ ফেব্রুয়ারি’। আমরা বাঙালিরা ভারি আবেগপ্রবণ আর আমাদের এই চিত্তচাঞ্চল্য, ব্যাকুলতা ব্যঞ্জনা পায় আমাদের মুখের বুলিতে, আমাদের লেখনীতে, আমাদের যাপিত জীবনের ভাষাতে। আর যেই ভাষা আমাদের সমস্ত আবেগ আর আকুলতার প্রকাশবাহন, তাকে ঘিরে আমরা ব্যাকুল হবো, উদ্বেলিত হবো- তাই-ই তো স্বাভাবিক। আর দিনপঞ্জীর নিয়ম মেনে ফেব্রুয়ারি এলে বাংলা ভাষাকে ঘিরে আমাদের উচ্ছ্বাস বাড়ে বহুগুণ, আমাদের গর্বের পারদ হয়ে ওঠে ঊর্ধ্বমুখী।  ‘আমাদের হৃদয়ে, মননে বাংলা ভাষা’ এমন শব্দাবলীর বিন্যাসে আমাদের আত্মতুষ্টি দৃশ্যায়মান হয় সর্বত্র। 

শহীদ মিনারের বেদিতে আজ শোভা পাচ্ছে আলপনা, দেয়ালে দেয়ালে মনীষী, কবি ও সাহিত্যিকদের ভাষা আন্দোলন ও ভাষা নিয়ে রচিত বাণী। দেয়ালের গ্রাফিতিতে জীবন্ত হয়ে স্লোগান হয়েছে উঠেছেন সালাম, রফিক, জববার, বরকতরা। তারা বলছেন, ‘রাষ্ট্রভাষা! রাষ্ট্রভাষা!, বাংলা চাই! বাংলা চাই!’ পারিপার্শিক অবস্থা দেখে কারও কাছে হঠাৎ মনে হতে পারে যে, তিনি বায়ান্ন’র রক্তমাখা মিছিলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে প্রত্যক্ষ করছেন সবকিছু।

‘ভাষা আন্দোলন’ আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম ধাপ। তখন থেকেই বাঙালিরা বুঝতে পেরেছিল যে, সংগ্রাম ছাড়া কিছুই হবার নয়। যদিও বাংলা ভাষা বঙ্গ অঞ্চলের বাঙালি অধিবাসীর মাতৃভাষা। স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ, ভারতের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা নিয়ে এই অঞ্চল গঠিত। এছাড়া ভারতের আসাম রাজ্যের দক্ষিণাংশেও এই ভাষা বহুল প্রচারিত। ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের অধিকাংশ অধিবাসী বাংলা ভাষায় কথা বলে থাকেন। বাংলা ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার বঙ্গ অঞ্চলের স্থানীয় ভাষা। এই অঞ্চলটি বর্তমানে রজনৈতিক ভাবে স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ ও ভারতের অঙ্গরাজ্য পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে গঠিত। এছাড়াও ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, আসাম রাজ্যের বরাক উপত্যকা এবং আন্দামান দ্বীপপুঞ্জেও বাংলা ভাষাতে কথা বলা হয়। এই ভাষার লিপি হল বাংলা লিপি।

এই অঞ্চলের প্রায় বাইশ কোটি স্থানীয় মানুষের ও পৃথিবীর মোট ৩০ কোটি মানুষের ভাষা হওয়ায় এই ভাষা বিশ্বের সর্বাধিক প্রচলিত ভাষাগুলোর মধ্যে চতুর্থ স্থান অধিকার করেছে। বাংলাদেশ, ভারত ও শ্রীলঙ্কার জাতীয় সঙ্গীত এবং ভারতের জাতীয় সংগীত এই ভাষাতেই রচিত এবং তা থেকেই দক্ষিণ এশিয়ায় এই ভাষার গুরুত্ব বোঝা যায়। বাংলাদেশ ছাড়াও ১৯৫০-এর দশকে ভারতের বিহার রাজ্যের মানভূম জেলায় বাংলা ভাষা আন্দোলন ঘটে। ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দের ভারতের অসম রাজ্যের বরাক উপত্যকায় এইরকমভাবে বাংলা ভাষা আন্দোলন হয়। ১৯ মে, শিলচরে বাংলা ভাষার দাবিতে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন আন্দোলনরত ১১ জন। ১৯৫১-৫২ সালে পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি জনগণের প্রবল ভাষা সচেতনতার ফলস্বরূপ বাংলা ভাষা আন্দোলন গড়ে ওঠে। এই আন্দোলনে পাকিস্তান সরকারের নিকট বাংলা ভাষার সরকারি স্বীকৃতির দাবি করা হয়। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে শহীদ হন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ আরো অনেকে। বাংলাদেশে প্রতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলন দিবস পালিত হয়। ইউনেস্কো এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা দান করে ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর। 

ভাষা বহমান আর এই বহমানতাই তাকে বাঁচিয়ে রাখে, তাকে সমকালীন করে তোলে নিরন্তর। বাঙালি আর বাঙালির বাংলা ভাষা-দুইই মিশ্র প্রকৃতির। সে কারণেই বাংলাভাষার শব্দ ভাণ্ডারে তৎসম, তদ্ভব, দেশি শব্দের সঙ্গে ফারসি, আরবি, তুর্কি, হিন্দি, উর্দু থেকে শুরু করে ওলন্দাজ, ইংরেজিসহ নানান ভাষার শব্দ সহজাতভাবেই জুড়ে গেছে। ধীরে ধীরে এগুলো বাঙালির নিজস্ব শব্দ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে ঊনিশ শতকে ইংরেজি সভ্যতার সংস্পর্শে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বাঁকবদলের ইতিহাস ঘাটলে এর সমান্তরাল এক বিপরীতমুখী চিত্র পাওয়া যায়। সেই সময়কার ভাষা দ্বন্দ্বের কবলে পড়ে ‘হিন্দু বাংলা’ বনাম ‘মুসলমান বাংলা’সহ দোভাষী পুঁথির যে বাংলার উদাহরণ মেলে, সেখানে কোনো স্বাভাবিক আত্তীকরণের গল্প নেই। এই ইতিহাস বিষঙ্গের, এই ইতিহাস বিযুক্তির। ইতিহাস প্রমাণ দেয় ১৯৪৭ সালের সমসাময়িক সময়ে বাংলা ভাষার চিরচেনা রূপকে এক অর্থে জলাঞ্জলি দিয়েই তাকে অচেনা করে তুলেছিলেন সাহিত্যিকরা। হুমায়ূন আজাদ তাঁর ‘ভাষা আন্দোলন: সাহিত্যিক পটভূমি’ এ ধরনের বেশ কিছু উদাহরণ উদ্ধৃত করেছেন। কালের নিয়মে, জীবনের প্রয়োজনে সংস্কৃতি বদলায়, বদলায় আচার, ব্যবহার, জীবনবোধ। সংস্কৃতি কোনো স্থবির বিষয় নয়, এটি চিরচলমান প্রক্রিয়া। আর সংস্কৃতি বদলায় বলে ভাষাতেও তার পরিবর্তন আসে, আর তা আসে খুব স্বাভাবিক সহজাত নিয়মেই। 

তবে মাতৃভাষাকে ব্যবচ্ছেদ করে নয়, বিসর্জন করে নয়, বাঙালিকে শেকড় আঁকড়ে ধরে মাথা উঁচু করে বাঁচতে শিখতে হবে, নিজের মাটিতে নোঙর ফেলে চিন্তার আধুনিকতায় মুক্ত হতে হবে। সত্যিকার অর্থে বিশ্বনাগরিক হতে গেলে নিজের আত্মপরিচয় ভুলে নয় বরং নিজের ভাষা, সংস্কৃতিকে জেনে, বুঝে, তাকে মনে আর মননে ধারণ করতে হবে। 

এদিকে, গত দুই বছর করোনার কারণে শহীদ মিনারের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের ক্ষেত্রে লোকসংখ্যা নির্দিষ্ট করা হলেও এবারের তেমনটি করা হয়নি। তবে সুষ্ঠুভাবে দিবসটি উদ্যাপনের লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের অনুরোধ জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান। রাত ১২টা ১মিনিটে একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের বেদিতে প্রথম পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন রাষ্ট্রপতি। এর পর প্রধানমন্ত্রী। এর পর পরই জাতীয় সংসদের স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রীবর্গ, জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পরে পর্যায়ক্রমে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন তিন বাহিনীর প্রধান, ভাষাসৈনিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, অনুষদের ডিন ও হলের প্রাধ্যক্ষরা। এদের পর সর্ব সাধারণের শ্রদ্ধার জন্য শহিদ মিনার এলাকায় উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।

অন্যদিকে, অমর একুশে ফেব্রুয়ারি মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে আওয়ামী লীগ। কর্মসূচির মধ্য রয়েছে, রাত ১২টা ১মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ অর্পণ (রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পর)। ভোর সাড়ে ৬টায় সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, বঙ্গবন্ধু ভবনসহ সারাদেশে সংগঠনের সকল শাখা কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ ও কালো পতাকা উত্তোলন। সকাল ৭টায় কালো ব্যাজ ধারণ, প্রভাতফেরী সহকারে আজিমপুর কবরস্থানে ভাষা শহীদদের কবরে ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ অর্পণ ও শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। এছাড়াও বিকেল সাড়ে ৩টায় দলের পক্ষ থেকে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এই আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। সভায় সভাপতিত্ব করবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এক বিবৃতিতে ‘মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ উপলক্ষে গৃহীত আওয়ামী লীগের  কেন্দ্রীয় কর্মসূচির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মসূচি গ্রহণ করে যথাযোগ্য মর্যাদায় ‘অমর একুশে’ দিবস পালন করার জন্য সকল স্তরের নেতাকর্মী, সমর্থক এবং সর্বস্তরের জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ।


আরও পড়ুন