ঢাকা সোমবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০২২

রেলে জনবল সংকট


এম. শাহজাহান photo এম. শাহজাহান
প্রকাশিত: ২৪-১১-২০২২ দুপুর ১২:৩০

তীব্র জনবল সঙ্কটে পড়েছে বাংরাদেশ রেলওয়ে। এই সঙ্কট দিন দিন আরও ঘনীভূত হচ্ছে। অনেকদিন থেকে গুরুত্বপূর্ণ বেশকিছু পদে লোকবল না থাকার কারণে ব্যাহত হচ্ছে কার্যক্রম। এ কারণে কমে যাচ্ছে রেলের আয়। তাছাড়া সময়মতো ট্রেন গন্তব্যে না পৌঁছানোয় যাত্রীরাও পড়ছেন দুর্ভোগে। অপরদিকে রেলের সিনিয়র কর্মীদের মধ্যে অনেকে এরই মধ্যে অবসরে গেছেন; আগামী দুই এক বছরের মধ্যে আরও অনেক কর্মকর্তা অবসরে যাবেন। তখন রেল পরিচালনা সমস্যা প্রকট হবে। 

রেল সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, রেলে জনবল সংকট রয়েছে। বিশেষ করে রেলে সৃষ্ট শূন্যপদ পূরণে কর্তৃপক্ষের ধীর গতিতে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারি ও প্রকৌশলীদের মধ্যে। নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের এমন অবহেলায় লাভের মুখ দেখতে পারছে না দেশের যাতায়াতে প্রয়োজনীয় এই সার্ভিসটি। সরকারের অগ্রাধিকার ভিত্তিক মেগাপ্রজেক্টসহ সবচেয়ে বেশি ব্যয় করে প্রায় অর্ধশত প্রকল্পের মধ্যে দিয়েও এ প্রতিষ্ঠানকে লাভের আওতায় আনতে পারছে না। বিশেষ করে সৃষ্টপদে নিয়োগ না দিয়ে দৈনিক ভিত্তিক কর্মচারি দিয়ে রেলের গুরুত্বপূর্ণ কাজ করিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে একদিকে আসছে না কাজের স্বতঃস্ফূর্ততা ও অপরদিকে সহজেই শ্রমিকদের ঠকিয়ে হৃষ্টপুষ্ট হচ্ছেন অসৎ কর্মকর্তারা। 

এদিকে অস্থায়ী শ্রমিকদের বাদ দিয়ে আউটসোর্সিং ভিত্তিতে শ্রমিক নিয়োগের সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে কমলাপুর রেলস্টেশন এলাকায় অবস্থান ও বিক্ষোভ করেছেন অস্থায়ী রেল শ্রমিকরা। তারা চাকরি স্থায়ী করার দাবি তুলেছেন। তাছাড়া গত ৩ অক্টোবর একই দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেন শ্রমিকরা। আন্দোলনরত শ্রমিকরা রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বাসভবনের সামনেও ছয় দফা দাবি তুলে ধরে নানারকম স্লোগান দিয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। যদিও রেলকে অচলাবস্থা থেকে ফেরাতে আগামীকাল প্রায় দেড় শতাধিক লোক নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা হবে।

জানা গেছে, দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে বর্তমানে ৪ হাজার ২৯৬ জনের মতো কর্মী কাজ করছেন রেলে। তাদের প্রত্যেকের দৈনিক মজুরি সর্বনিম্ন ৫০০ থেকে সর্বোচ্চ ৫৭৫ টাকা। দৈনিক মজুরি খাতে গত অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত ৬০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। আগামী অর্থবছরে এর জন্য ৮০ কোটি টাকার মতো প্রয়োজন হবে।
রেলে বর্তমানে অনুমোদিত সৃষ্টপদের সংখ্যা ৪৭ হাজার ৬৩৭। এরমধ্যে কর্মরত আছে ২৪ হাজার ৯৩৩ জন। লোকবলের ঘাটতি ২২ হাজার ৭০৪ জন। অর্থাৎ শূন্যপদের সংখ্যা ৪৮ শতাংশ। তবে জনবলকাঠামো আরও বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত আছে সরকারের। কিন্তু নিয়োগপ্রক্রিয়া বেশ জটিল। মামলা-মোকদ্দমা ও দুর্নীতির কারণে সময়মতো লোকবল নিয়োগ দিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। ফলে স্টেশনমাস্টার, সহকারী মাস্টার, ট্রেন ও রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণের লোকবলের সংকট আছে। এ জন্য রেলওয়ে থেকে অবসরে যাওয়া কর্মী, দীর্ঘদিন ধরে রেলে নানাভাবে যুক্ত ব্যক্তিদের দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে নিয়োগ দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। রেলওয়ে সূত্র এসব তথ্য জানা গেছে। 

জানা গেছে, রেলওয়ের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত ও ব্যাপক দুর্নীতি হয় নিয়োগের ক্ষেত্রে। এক একটি পদের বিপরীতে ৭-১০ লাখ টাকা ঘুষ নেয়ার তথ্য তদন্ত রিপোর্টে উঠে এসেছে, যা নিয়ে রেলওয়ের বিরুদ্ধে ২৮টি মামলা করেছেন নিয়োগ বঞ্চিতরা।তদন্ত রিপোর্টে বলা হয়েছে, লিখিত পরীক্ষায় ১৩ পাওয়া প্রার্থীকে খাতায় নম্বর কেটে ৭৩ নম্বর লিখে দেয়া হয়, আবার ৯ পাওয়া প্রার্থীকে অর্থের বিনিময়ে ৮৯ নম্বর খাতায় লিখে দিয়ে চাকরিতে নিয়োগ করা হয়। এসবের বিরুদ্ধে চাকরি না পাওয়া প্রার্থীরা হাইকোর্টের শরণাপন্ন হন। সে কারণে ওই পদে নিয়োগ বন্ধ হয়ে আছে দীর্ঘদিন। এর ফলে লোকবল সমস্যায় জর্জরিত বাংলাদেশ রেলওয়ে। এছাড়া রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে একজন কম্পিউটার ডাটা অপারেটর ভুয়া নিয়োগ দিয়ে মাসের পর মাস বেতন ভাতা বাবদ ৭০-৭৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন, যা সবার জানা। বর্তমানে তিনি হাজতবাস করছেন।

এসব কারণে অনুমোদিত জনবলের চেয়ে ৪৮ শতাংশ কম কর্মী নিয়ে চলছে রেলওয়ে। ঘাটতি পোষাতে দীর্ঘদিন ধরে দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে লোক নিয়োগ দিয়ে কাজ চালিয়ে আসছে সংস্থাটি। এ কাজে আর টাকা দিতে রাজি নয় অর্থ মন্ত্রণালয়। সংকট কাটাতে স্থায়ীভাবে লোক নিয়োগ দেওয়ার আগে প্রয়োজন হলে ঠিকাদারের মাধ্যমে আউটসোর্সিং-এ কাজ চালানোর পরামর্শ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। কিন্তু রেলওয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, ঠিকাদারের মাধ্যমে লোক নিয়োগ দিলে খরচ বাড়বে। কারণ মধ্যস্বত্বভোগী হিসেবে ঠিকাদারের পকেটে কিছু টাকা যাবে। আবার সময়মতো অভিজ্ঞ লোক পাওয়া যাবে না। এ পরিস্থিতিতে স্থায়ীভাবে অনুমোদিত লোকবল নিয়োগের আগপর্যন্ত দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে নিয়োগপ্রথা চালু রাখার পক্ষে রেলওয়ে। 
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা যাদের দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে নিয়োগ দিয়ে থাকে, তাদের প্রায় সবাই সংশ্লিষ্ট কাজে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। ঠিকাদারের মাধ্যমে এ ধরনের অভিজ্ঞ ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন লোক পাওয়া যাবে না। এতে রেল চলাচল বাধাগ্রস্ত হবে।

দৈনিক মজুরিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে যেসব কাজ চালানো হয়, তার মধ্যে রয়েছে কারখানার মেরামত, ইঞ্জিন-কোচ ও রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণ, স্টেশন ও ট্রেন পরিচালনা, মালামাল সংগ্রহ ও বিতরণ, রেলক্রসিং পাহারা, সংকেতব্যবস্থা রক্ষণাবেক্ষণ, বৈদ্যুতিক স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা।
রেল থেকে সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়েছে, রেল পরিচালনা সার্বক্ষণিক চলমান প্রক্রিয়া। অনিয়মিত শ্রমিকেরা দীর্ঘদিন কাজ করার কারণে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেছেন। ট্রেন পরিচালনায় তাদের নিরাপত্তা জ্ঞানও রয়েছে। ফলে তাদের দ্রুততম সময়ে নিয়োগ করা ও কাজে লাগানো যায়। এটা বন্ধ হয়ে গেলে সময়মতো ট্রেন পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে।

জানা গেছে, রেলের পশ্চিমাঞ্চলে রয়েছে ১৭৫টি স্টেশন। লোকবলের অভাবে বন্ধ রয়েছে ৫৪টি। বাকি ১২১টি স্টেশন চালু রয়েছে। বন্ধ স্টেশনগুলোতে টিকিট বিক্রি হয় না। এতে ট্রেনে ওঠে টিটি ও যাত্রীদের টিকিট কাটা নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। এমন অবস্থায় অনেক যাত্রীই বিনা টিকিটে ভ্রমণ করছেন। ফলে প্রতিদিন রেলওয়ের হাজার হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে।

রেল সূত্রে জানা গেছে, ঈশ্বরদী-ঢালারচর রেলপথে ১০টি স্টেশন রয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি স্টেশনে টিকিট বিক্রি বন্ধ হয় গেলো ১৭ অক্টোবর থেকে। সপ্তাহখানেক বন্ধ থাকে টিকিট বিক্রি। এই স্টেশনগুলোতে রেলওয়ের নিজস্ব কোনো লোকবল নেই। স্টেশনগুলো চলত দৈনিক মজুরিপ্রাপ্ত টিআরএল (টেম্পোরারি লেবার রিক্রুট) লোকবল দিয়ে। টিআরএল লোকবল ঢাকায় আন্দোলনে যোগ দেয়ায় স্টেশনগুলো ফাঁকা হয়ে পড়ে। এতে করে টিকিট বিক্রি বন্ধ হয়ে যায়।
পশ্চিমাঞ্চল রেলের পাকশী বিভাগীয় কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৮ সালের জুনে ঈশ্বরদী-ঢালারচর রেলপথটি চালু হয়। ঢালারচর থেকে রাজশাহী পর্যন্ত ‘ঢালারচর এক্সপ্রেস’ নামে একটি ট্রেন চলাচল করছে। সকালে ট্রেনটি ঢালারচর থেকে রাজশাহীর উদ্দেশে ছেড়ে যায়। বিকেলে আবার ফিরে আসে।

নতুন রেলপথে ঢালারচর থেকে ঈশ্বরদী পর্যন্ত স্টেশন রয়েছে মোট ১০টি। কিন্তু স্টেশনগুলোর জন্য রেলওয়ে পর্যাপ্ত লোকবল নিয়োগ দেয়নি। ১০টি স্টেশনের মধ্যে বাঁধের হাট, কাশিনাথপুর, সাঁথিয়া, রাজাপুর, তাঁতিবন্ধ, দুবলিয়া, রাঘবপুর এই ৭টি স্টেশনে রেলওয়ের নিজস্ব কোনো লোকবল নেই। দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে অস্থায়ী লোকবল দিয়ে স্টেশনগুলো চালানো হয়। তবে গত ১৭ অক্টোবর ওই কর্মীরা তাদের চাকরি স্থায়ীকরণের দাবিতে আন্দোলনে নামে। তারা সবাই ঢাকা চলে যায়। এতে স্টেশনগুলোর সব কার্যক্রম ও টিকিট বিক্রি বন্ধ হয়ে যায়।
রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন এ প্রসঙ্গে বলেছেন, লোকবলের অভাবে অনেক স্টেশন বন্ধ হয়ে আছে। লোকোমটিভ মাস্টার, কারখানা, সিগন্যাল বেল্ট, ওয়েব্যান সব ক্ষেত্রেই বিরাট এক ঘাটতি চলছে। একজন লোক নেয়ার পর সঙ্গে সঙ্গেই কাজে লাগানো যায় না, তার প্রশিক্ষণেরও দরকার রয়েছে। আমাদের অনেক ব্যত্যয় রয়েছে। লোকবল সংকটের কারণে ছোটখাটো দুর্নীতিগ্রস্ত লোকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে বিকল্প লোক সেখানে দেয়ার মতো লোকবল নেই।

এমএসএম / এমএসএম