আবার রোহিঙ্গা ঢলের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

news paper

টেকনাফ কক্সবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৪-৮-২০২৫ দুপুর ১:৪০

112Views

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত এবং আরাকান আর্মির নির্যাতনের কারণে অন্তত এক লাখ রোহিঙ্গা সীমান্তে অপেক্ষায় আছে। সুযোগ পেলেই তারা যে কোনো সময় বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে। এমন পরিস্থিতি হলে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে মানবিক সংকটের পাশাপাশি নিরাপত্তা পরিস্থিতিও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে অনেকে এখনও রাখাইনের ভয়াবহ স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছে। আরাকানের বুথিডং থেকে কোনোমতে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে আসা সেলিম নামে এক যুবক জানান, আরাকান আর্মির নির্যাতনে তিনি মাসহ পরিবারের তিনজনকে হারিয়েছেন। যদিও নিজে প্রাণে বেঁচে আছেন, কিন্তু চোখের সামনে পরিবারের সদস্যদের হারানোর বেদনা তাকে আজীবন তাড়া করবে। ক্যাম্পের ভেতর গিয়ে দেখা যায়, অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, কারও হাত কেটে নেওয়া হয়েছে, আবার কেউ কেউ আর কখনও স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারবেন না।

শুক্রবার রাত ১০টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত টানা গোলাগুলির শব্দ শোনা গেছে টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্তে। স্থানীয় ইউপি সদস্য সিরাজুল মোস্তফা চৌধুরী বলেন, হঠাৎ করেই ওপারের গ্রামগুলোতে সংঘর্ষ শুরু হয়। এতে নাফ নদে থাকা জেলেসহ সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এর আগেও দীর্ঘ সময় সীমান্তে মর্টারশেলের বিকট শব্দে মানুষ আতঙ্কে দিন কাটিয়েছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত ছিল। হঠাৎ নতুন করে গোলাগুলির শব্দে বাসিন্দারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।

বিজিবি টেকনাফ ২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল আশিকুর রহমান বলেন, কিছু লোক সীমান্তে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছেন। কিন্তু কাউকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। অনুপ্রবেশের সম্ভাব্য পয়েন্টগুলোতে টহল ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সীমান্তে পরিস্থিতি জটিল হওয়ায় কোস্টগার্ড ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও সতর্কাবস্থানে আছে বলে জানিয়েছেন টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ এহসান উদ্দিন।

এদিকে গত এক বছরে নতুন করে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে বলে গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যে জানা গেছে। এখনও অন্তত এক লাখ রোহিঙ্গা সীমান্তে অপেক্ষা করছে। শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষ নাগাদ আরও অর্ধলক্ষ রোহিঙ্গা প্রবেশের শঙ্কা রয়েছে। কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, সীমান্তে এখন বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বর্ডার দিয়ে প্রতিনিয়ত মাদক, অস্ত্রসহ নানা অপরাধমূলক কার্যক্রম বাড়ছে। সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ সর্বদা তৎপর থাকলেও চ্যালেঞ্জ ক্রমেই বাড়ছে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, সামরিক জান্তা বা নির্বাচিত সরকার যেই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, মিয়ানমারের নীতির পরিবর্তন না হলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়। 

তিনি উল্লেখ করেন, আফগানিস্তান, প্যালেস্টাইন বা ইউক্রেনের শরণার্থীরা তৃতীয় দেশে আশ্রয় পেলেও রোহিঙ্গারা সে সুযোগ পায়নি। ফলে বাংলাদেশে তাদের চাপ বেড়ে যাচ্ছে। সীমান্তে অস্থিরতার মধ্যে বিজিবি সম্প্রতি আরাকান আর্মির এক সদস্যকেও আটক করেছে, যিনি অস্ত্রসহ পালিয়ে এসেছিলেন। নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানায়, এ পর্যন্ত পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে, তাদের মধ্যে তিনজন মিয়ানমারের নাগরিক।

২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও রাখাইনদের নির্যাতনে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। নাফ নদের ওপারে মংডু এলাকা থেকে শুরু হওয়া সেই ঢল অব্যাহত রয়েছে। এবারও একই ধরনের সংকটের মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশ। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া কার্যকর না হলে নতুন করে রোহিঙ্গাদের ঢল নামা কেবল সময়ের ব্যাপার।


আরও পড়ুন