বিএনপির অন্তর্কোন্দল দু:সময়েও প্রকট

news paper

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া

প্রকাশিত: ২১-১১-২০২৩ বিকাল ৫:৫৩

59Views

সমস্যা পিছু ছাড়ছে না জনবিচ্ছিন্ন ও সন্ত্রাসী সংগঠন বিএনপির। ১৫ বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা দেশের এই দলটি এখনো নানা সংকটে। গত ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তাদের নিজেদের মধ্যে সৃষ্ট সংকট কাটাবার উদ্দেশ্য নিয়ে দল পুনর্গঠন করতে গিয়েও সংকটের অবসান হয়নি। নির্বাচনকে ঘিরে কয়েক দফা আন্দোলনেও সফল হতে পারেনি। বর্তমানেও নিজেদের অন্তর্কোন্দল আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এতদিন ক্ষমতার বাহিরে থাকা বিএনপির এমন দুঃসময়েও প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেখানে বিরোধী দল হিসেবে অংশগ্রহণ করার কথা সেখানে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলের ভিতর অন্তর্কোন্দল বেড়ে যাওয়ায় এক বিএনপি দল এখন কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণের কথা ভাবছে। বিএনপির এই অন্তর্কোন্দলের ফলে নেতৃত্বহীন অবস্থান চলছে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তাদের আন্দোলন। বহুদলে বিভক্ত বিএনপির একটি অংশের রাজনীতির মূল ভাষা এখনোও মানুষ পুড়ানো এবং মানুষ হত্যা। যারা এই ধরনের কাজ করতে পারবে তাদের গ্রহণযোগ্যতা এই দলে অনেক বেশি। আর যারা তা করতে ব্যর্থ হয় তাদের দল থেকে বহিস্কার করে দেওয়া হয়। বিএনপির এই অংশের নেতারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দ্বারা গত ২৮ শে অক্টোবর থেকে মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে এবং মহাসমাবেশের নামে জ্বালাও-পোড়াও এবং আগুন সন্ত্রাস করা নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন। কিন্তু অন্য অংশের নেতৃবৃন্দ ঠিকই তাদেরকে বৃদ্ধা আঙুল দেখিয়ে ভিন্ন ভিন্ন নামে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছে। তারা হলেন বিএনপির সন্ত্রাসী নেতা তারেক রহমানের আদেশে বিভিন্ন সময় জ্বালাও-পোড়াও করতে ব্যর্থ হওয়ায় এবং বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে বহিস্কার করেছে এমন সব বিএনপির সাবেক নেতৃত্ববৃন্দ। তারেক রহমানের নির্দেশে তারা আগুন সন্ত্রাস করতে পারেনি বলে বিভিন্ন সময়ে বিএনপি থেকে বহিস্কৃত হয়েছেন। আর যারা আন্দোলনের নামে অগ্নি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে জনগণের জীবনকে বিষিয়ে তুলছে তারাই কেবল রয়ে গিয়েছে মূল বিএনপিতে।

বিএনপিতে অন্তর্কোন্দলের ফলে অনেক ক্ষেত্রে ক্লিন ইমেজের অনেক সাবেক নেতা বিএনপি থেকে বহিস্কৃত হয়ে গড়ে তুলেছে ভিন্ন ভিন্ন দল। বিএনপির বিভিন্ন নেতা বিভিন্ন সময়ে বিএনপি দল ত্যাগ করে গিয়ে নতুন দল গঠন করেছেন। তালিকায় শুরুতেই বলা যায় বিকল্প ধারার কথা। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় ২০০১ সালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। পরে ২০০২ সালের জুন মাসে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। পরে তিনি বিএনপি থেকেও পদত্যাগ করেন। তার পদত্যাগের আগে অবশ্য সংসদে তার অভিশংসন নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। বিএনপির পক্ষ থেকে তাকে পদত্যাগ করতে সর্বসম্মতিক্রমে আহ্বানও জানানো হয়েছিল।

তার বিরুদ্ধে সেসময় বিএনপি যেসব অভিযোগ এনেছিল তার মধ্যে রয়েছে - বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে তার কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে না যাওয়া, এবং জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে উল্লেখ না করা। দুই হাজার দুই সালে পদত্যাগের পর মি. চৌধুরী ২০০৪ সালের মার্চে বিকল্প ধারা বাংলাদেশ নামে নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। তিনি এখনো দলটির সভাপতি হিসেবে রয়েছেন। এই দলটির মহাসচিবের পদ রয়েছেন আরেক সাবেক বিএনপি নেতা এম এ মান্নান।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ইতিহাসবিদ মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন,বদরুদ্দোজা চৌধুরী জানতেন যে তার নিজের কোন শক্তি নাই। বিএনপির শক্তিতে তিনি রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। “গো ধরে বসে থাকার মতো মনের জোর তার ছিল না। তিনি পদত্যাগ করলেন। পদত্যাগ করার পর তিনি নানা ভাবে নিগৃহীত হয়েছেন। পরে তিনি বিকল্প ধারা তৈরি করেন। এরপর ২০০৬ সালের ২৬শে অক্টোবর কর্নেল অলি আহমেদ বিএনপি থেকে বেরিয়ে লিবেরাল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপি নামে নতুন দল ঘোষণা করেন। কর্নেল অলি আহমেদ ছাড়াও বিএনপির ১১ জন সংসদ সদস্য ওই নতুন দলে যোগ দেন। তাদের মধ্যে ছিলেন, জাতীয় সংসদের সাবেক স্পীকার শেখ রাজ্জাক আলী, সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী আনোয়ারুল কবির তালুকদার, জাহানারা বেগম, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী আলমগীর কবিরসহ বেশ কয়েকজন নেতা। 

কয়েক বছর পরে ২০১২ সালের জুনে বিএনপি থেকে পদত্যাগ করেন দলটির আরেক শীর্ষ নেতা নাজমুল হুদা। পদত্যাগের আগ পর্যন্ত তিনি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকারের সময় তথ্যমন্ত্রী এবং পরে ২০০১ সালে গঠিত সরকারের যোগাযোগ মন্ত্রী ছিলেন। যাদের হাতে বিএনপি দলটি গড়ে উঠেছিল মি. হুদা ছিলেন তাদের একজন। আবার এই দল থেকে তিনি বহিষ্কৃতও হয়েছেন। আর এসব হয়েছে বিএনপির অন্তর্কোন্দলের কারণে।

বিএনপি থেকে বের হয়ে শুধু দল গঠনের ক্ষেত্রেই তারা সীমাবদ্ধ থেকেছেন বিষয়টি এমন না বরং তারা নিজেদের নতুন পরিচয়ে আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে বিএনপি থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণে বহিস্কৃত নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত সংগঠন তৃণমূল বিএনপি নেতা অন্তরা হুদা বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন করার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তার দল ৩০০ আসনে প্রার্থী দেবে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরেই তাদের মহাপরিকল্পনা রয়েছে। এই নির্বাচনে যেন জনপ্রিয় এবং ভালো প্রার্থীরা অংশগ্রহণ করতে পারে সেই জন্যই জাতীয় নির্বাহী কমিটিকে পুনর্গঠন করা হলো। এর মাধ্যমে অন্যান্য বিএনপি নেতা যারা নির্বাচন করতে চান এবং এলাকায় যাদের জনপ্রিয়তা আছে তাদের প্রবেশগম্যতার সুযোগ করে দেওয়া হলো। তারা তৃণমূলে যোগ দিলে এই দলটি আরও শক্তিশালী হবে। তবে তৃণমূল বিএনপি সরকারের কোনো পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে নয় বরং জাতীয়তাবাদী চেতনার সত্যিকারের রাজনৈতিক দল হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছে বলে ওই তৃণমূল বিএনপি দলের নেতারা বলেছেন।

বিএনপির নির্বাচন করা না করার ওপর তৃণমূল বিএনপির আকৃতি এবং বিস্তার অনেকখানি নির্ভর করছে। যদি শেষ পর্যন্ত বিএনপি আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে সেক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে ব্যর্থ বিএনপি অনেক নেতাকর্মী তৃণমূল বিএনপিতে যোগ দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চাওয়ার মাধ্যমে এই তৃণমূল বিএনপিতে বড় ধরনের চমক আসার মাধ্যমে নতুন সমীকরণ তৈরী হবে। কারণ বিএনপির অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতাই তৃণমূল যোগ দিতে পারেন বলে অনেকে মনে করছেন। এমনকি বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির অনেক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এখন যারা রাজপথে আন্দোলনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সক্রিয় এরকম বেশ কিছু নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে তৃণমূল বিএনপির পক্ষ থেকে। তৃণমূলের যে দুজন নেতা দায়িত্ব নিয়েছেন তাদের সঙ্গে বিএনপির বিভিন্ন অংশের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে এমন অনেকেই হয়তো সামনে এই তৃণমূল বিএনপির নেতৃত্বে চলে আসবে। আর এর মাধ্যমে রাজনৈতিক আদর্শ বহির্ভূত এবং সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিশ্বে পরিচিত বিএনপি দল সামনে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই অস্তিত্ব সংকটে ভুগবে।

তারমানে এই মূহুর্তে শমসের ও তৈমূরের নেতৃত্বে তৃণমূল বিএনপি দল গঠনের পরে বিএনপিকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে নির্বাচনে না গিয়ে বিএনপি কি ধ্বংস হবে, না বিএনপি রাজনীতিতে অবস্থান নিয়ে থাকবে? বিএনপি নির্বাচন না করে আন্দোলনে থাকলে শেষ পর্যন্ত বিএনপি হাতেগোনা কয়েকজন নেতার দলে পরিণত হবে। নির্বাচনে এলে বিএনপি টিকবে এমন দাবি করে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারাও ভেবেছেন যে নেতৃত্বের প্রতি অখুশি যারা ও নির্বাচনে আসতে চাওয়া নেতারা মূলত তাদের ঠিকানা তৈরি করেছেন তৃণমূল বিএনপি গঠন করে। তৃণমূল বিএনপি মূলত বিএনপির ভেতরের খালেদা জিয়াপন্থি বড় অংশের সিদ্ধান্তের ফল। তারেকপন্থি বিএনপির নেতারা দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন বয়কট করতে চান। এবং সেই লক্ষ্যে আন্দোলনের নামে তারা এখনো হরতাল, অবরোধ দিয়ে জ্বালাও-পোড়াও করে নির্বাচন বানচালের অপপ্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে খালেদাপন্থি নেতারা নির্বাচন করতে চান। যে কারণেই মূলত আত্মপ্রকাশ ঘটেছে তৃণমূল বিএনপির। শুধু তৃণমূল বিএনপি না বরং বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের প্রায় ১২৫ জন নেতা স্বতন্ত্র গণতন্ত্র মঞ্চের ব্যানারে আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। বিএনপি দলগতভাবে নির্বাচনে অংশ নিলেও তারা স্বতন্ত্র গণতন্ত্র মঞ্চের ব্যানারে ১২৫ জন বিএনপি নেতা আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়ার সব ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

সুতরাং, বিএনপির অন্তর্কোন্দলের পূর্বের ন্যায় এই দুঃসময়েও প্রকট হয়েছে। তাদের অন্তর্কোন্দলের ফলে বিভিন্ন সময়ে বিএনপি থেকে বহিস্কৃত নেতাদের দ্বারা গঠিত রাজনৈতিক দল তৃণমূল বিএনপি এবং গণতন্ত্র মঞ্চ আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সন্ত্রাসী সংগঠন বিএনপি তাদের অস্তিত্ব সংকটের পথে। অন্তর্কোন্দল একটা দলকে কিভাবে ধ্বংস করে দিতে পারে বিএনপির ধ্বংস সেই ইতিহাস হয়ে থাকবে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে।


আরও পড়ুন