প্রশাসনে নির্বাচনী ঢেউ

news paper

সিরাজুল ইসলাম

প্রকাশিত: ২৬-৭-২০২৩ বিকাল ৫:৫৭

101Views

    *পুলিশে বিশেষ পদোন্নতি
    *জেলা প্রশাসক রদবদল
    *সচিবালয়ে বদলি-পদায়ন
    *ইউএনও পরিবর্তন হচ্ছেন
    *সচিবদের বিশেষ সভার গুঞ্জন  

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র ৫ মাস বাকি। এরই মধ্যে রাজনীতিক দলগুলো মাঠে শক্তি জানান দিতে শুরু করেছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মাঠ দখলে রাখার ঘোষণা দিয়েছে। অন্যতম বড় দল বিএনপি মাঠ দখলের চেষ্টা করছে। সরকার ও নির্বাচন কমিশনও ধীরে ধীরে নির্বাচনী প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। এরই ঢেউ লেগেছে প্রশাসনেও। পুলিশ ও জনপ্রশাসনে ব্যাপক রদবদল শুরু হয়েছে। কয়েক জেলার জেলা প্রশাসক বদলি করা হয়েছে। অতিরিক্ত ও সহকারী পুলিশ সুপারও বদলি করা হয়েছে। ইউএনও হিসেবে নতুন মুখ দেখা যেতে পারে আভাস মিলছে। সচিবালয়েও ব্যাপক রদবদল হয়েছে। এদিকে, সচিবদের বিশেষ সভা নিয়েও গুঞ্জন তৈরি হয়েছে।

এসব পদোন্নতি ও বদলি নিয়ে বিএনপির অভিযোগ, সরকার নির্বাচনের আগে ইচ্ছেমতো প্রশাসন সাজাচ্ছে। তবে আওয়ামী লীগ বলছে, এ বদলি ও পদোন্নতির সঙ্গে নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই।‘বিশেষ পদোন্নতি’ পেলেন ৫২৯ পুলিশ কর্মকর্তা: পুলিশের উচ্চপর্যায়ের ৫২৯ কর্মকর্তাকে ‘বিশেষ পদোন্নতি’ দেওয়া হয়েছে। পদোন্নতি পেলেও তারা আগের পদে দায়িত্ব পালন করবেন। তাদের ইন সিটু পদায়ন (আগের পদে দায়িত্ব পালন) করা হবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, পুলিশ সদর দপ্তরের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ সুপার নিউমারি পদ সৃজন সংক্রান্ত কমিটি গঠন করে। কমিটি কয়েকটি বৈঠক করে। ২০ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ ও এনটিএমসি শাখার অতিরিক্ত সচিব মো. আলী হোসেনের সভাপতিত্বে সর্বশেষ সভা হয়। ওই সভায় ৫২৯ জনকে পদোন্নতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। পদোন্নতিপ্রাপ্তদের মধ্যে অ্যাডিশনাল আইজি (গ্রেড-১) পদমর্যাদার ১৫ এবং একই পদে গ্রেড-২ পদমর্যাদার ৩৪ কর্মকর্তা আছেন। এছাড়া ডিআইজি হিসেবে ১৪০, অতিরিক্ত ডিআইজি ১৫০ এবং পুলিশ সুপার পদমর্যাদার ১৯০ কর্মকর্তা আছেন।

সূত্র জানায়, এই ৫২৯ কর্মকর্তা ছাড়াও ২৮তম বিসিএস ক্যাডারের ১৫০ জন কর্মকর্তা অ্যাডিশনাল এসপি থেকে এসপি পদে পদোন্নতির অপেক্ষায় রয়েছেন। ২০১২ সালে বাহিনীতে যোগদানকারী ৩০তম বিসিএস ক্যাডার ব্যাচের ১৮২ পুলিশ কর্মকর্তা এবং পরের বছর চাকরিতে যোগ দেওয়া ৩১তম বিসিএস ক্যাডারের ১৮২ জন অ্যাডিশনাল এসপি থেকে এসপি পদে পদোন্নতির অপেক্ষায় রয়েছেন। এর আগে পুলিশের উচ্চপর্যায়ের ৭২০ কর্মকর্তার পদোন্নতি চেয়ে ইনসিটু পদায়নের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠায় পুলিশ সদর দপ্তর। ওই প্রস্তাবে ৫০ জন ছিলেন অতিরিক্ত আইজি। তাদের মধ্যে গ্রেড-১ পদমর্যাদায় ১৬ এবং গ্রেড-২ পদমর্যাদায় ৩৪ জন কর্মকর্তা। এছাড়া ১৫৭ জন ডিআইজি, ২৬৬ জন অতিরিক্ত ডিআইজি এবং ২৪৭ জন এসপি পদমর্যাদার কর্মকর্তা ছিলেন।

অন্যদিকে চলতি জুলাই মাসে প্রশাসন ও পুলিশে শতাধিক কর্মকর্তাকে বদলি ও পদায়ন করা হয়েছে। এরই মধ্যে ৩২ জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ২২ জন অতিরিক্ত সচিব ও উপ সচিবকে বদলি ও পদায়ন করা হয়েছে। একদিনে ৫১ জন ডিআইজি এবং অতিরিক্ত ডিআইজিকে বদলি  ও পদায়ন করা হয়েছে। আর একদিনে ১০ জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এই প্রক্রিয়া আরো চলবে বলে জানা গেছে। ৬ জুলাই অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও সহকারী পুলিশ সুপার পদমর্যাদার ২৬ জন কর্মকর্তাকে বদলি ও পদায়ন করা হয়। একই দিন দুইজন অতিরিক্ত সচিব ও চার জন উপসচিবকে বদলি ও পদায়ন করা হয়। এর আগে গত মাসে পুলিশের ২২ জন এসপি এবং সাত জন জিআইজিকে বদলি করা হয়েছে। গত ১২ মে পদ না থাকার পরও ১১৪ জন যুগ্ম সচিবকে পদোন্নতি দিয়ে অতিরিক্ত সচিব করা হয়। পুলিশের ৭২০ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতির বিষয় এখন বিবেচনাধীন। গত ৭ জুন তিনজন সচিব এবং একজন অতিরিক্ত সচিবকে বদলি করা হয়। বদলি করা হয় ১৪ জন যুগ্ম সচিবকে। ওই দিন পুলিশের ১৭ জন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকেও বদলি করা হয়।

জানা গেছে, মাঠ প্রশাসনে শিগগিরই শতাধিক নতুন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দেখা যাবে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) পদেও নতুন পদায়ন করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে পদায়নের জন্য ৩৫তম ব্যাচের তিন শতাধিক কর্মকর্তাকে ফিটলিস্টে রাখা হয়েছে। আর ৩৩তম ব্যাচের যে সকল কর্মকর্তা বর্তমানে ইউএনও হিসেবে দায়িত্বে আছেন তাদের ফিটলিস্ট করে এডিসি হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হবে বলে জানা গেছে। এর আগে গত ১২ মার্চ দেশের আট জেলায় নতুন ডিসি নিয়োগ দিয়েছে সরকার। গত বছরের ২৩ নভেম্বর ঢাকাসহ দেশের ২৩ জেলায় নতুন ডিসি নিয়োগ দেয়া হয়। এছাড়া গত আগস্ট মাসে ৪০ জেলায় নতুন পুলিশ সুপার পদায়ন করা হয়।

এদিকে ৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়ার অবসরে যাওয়ার কথা থাকলেও তাকে আরো এক বছরের জন্য একই পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ২৫ মে অবসরে যাওয়ার কথা ছিল প্রতিরক্ষা সচিব গোলাম মো. হাসিবুল আলমের। তার চাকরির মেয়াদও এক বছর বাড়ানো হয়েছে। ১৩ অক্টোবর মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. মাহবুব হোসেনের চাকরির মেয়াদ শেষে অবসরে যাওয়ার কথা। তার মেয়াদও বাড়ানো হচ্ছে বলে জানা গেছে। এই পদগুলোতে যারা দায়িত্ব পালন করেন, তারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কাজে সম্পৃক্ত থাকেন। জননিরাপত্তা বিভাগের অধীনে বাংলাদেশ পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, কোস্টগার্ড, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী রয়েছে। তাই এই বিভাগটি নির্বাচনের সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ অথবা জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা আছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা থেকে নির্বাচন পর্যন্ত প্রশাসনে বদলি বা অন্য সব সিদ্ধান্ত নেয় নির্বাচন কমিশন। সেই হিসেবে পুলিশ ও প্রশাসন তিন মাস তাদের অধীনে থাকে। ফলে সরকার বদলি, পদায়ন, পদোন্নতি তার আগেই করে ফেলতে চাইছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাবেক সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, এখানে দুইটি বিষয় আছে। সাধারণভাবে রুটিন বদলি এবং পদোন্নতি হতে পারে। সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু বিষয়টা হলো নির্বাচন কোন স্টাইলে হবে। যদি ২০১৪, ২০১৮ সালের মতো নির্বাচন হয় তাহলে কে এসপি কে ডিসি তাতে কিছুই আসে যায় না। আর যদি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা হয় তাহলে এই বদলি পদোন্নতি তেমন কোনো লাভ হবে না। তখন আবার পুলিশ ও প্রশাসনে নির্বাচনের আগে ব্যাপক রদবদল হবে। তিনি বলেন, এখন যে বদলি বা রদবদল হচ্ছে তাতে সরকারের টার্গেট থাকতে পারে। কিন্তু নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন হলে দলীয় মনোভাবাপন্ন যে কর্তকর্তারা আছেন তাদের আবার বদলি করা হবে। আর সেটা না হলে তো যেরকম হবার সেরকমই হবে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হাফিজ উদ্দিন খান মনে করেন নির্বাচন সামনে রেখেই পুলিশ ও প্রশাসনে বদলি রদবদল হচ্ছে। তারা চাচ্ছে তাদের মতো করে নির্বাচন করতে। তারা নির্বাচনের জন্য একটি প্রশাসন সাজাচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারে আসি তার আগেও আওয়ামী লীগ এভাবে প্রশাসন সাজিয়ে গিয়েছিল। আমরা এসে তা পরিবর্তন করি। এবার যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসে তাহলে আবারো পুলিশ প্রশাসনে পরিবর্তন আসবে। তা না হলে তো এভাবেই হবে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শাসসুজ্জামান দুদু বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার তাদের মতো করে একটি নির্বাচন করার জন্য প্রশাসন ও পুলিশকে ইচ্ছেমতো সাজাচ্ছে। তারা মনে করছে এভাবে একটি নির্বাচন করে পার পেয়ে যাবে। কিন্তু আমার মনে হয় তারা এটা পারবে না। পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। তারা একতরফা নির্বাচন করতে গেলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে। তারা যা চাইছে তা হবে না।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন বলেন, এখন যে বদলি পদোন্নতি হচ্ছে; তার সঙ্গে নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই। এগুলো রুটিন ওয়ার্ক। একজন কর্মকর্তা একই কর্মস্থলে সর্বোচ্চ তিন বছরের বেশি থাকতে পারেন না। আওয়ামী লীগ সরকার নয়, বিএনপি সরকারই অতীতে প্রশাসনে নগ্ন হস্তক্ষেপ করেছে। বিএনপি যদি কোনো ধ্বংসাত্মক কাজ না করে তাহলে আগামী নির্বাচন শেখ হাসিনার অধীনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে।

‘সচিব সভা’ নিয়ে গুঞ্জন: সোমবার সচিবালয়ে সচিবদের যে বৈঠক নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছিল, সেই বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. মাহবুব হোসেন বলেছেন, এটা সচিব সভা ছিল না, প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির বৈঠক ছিল এটি। মঙ্গলবার প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির বৈঠকের দিন নির্ধারিত ছিল। তার একদিন আগে সোমবার সচিবদের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে ডাকা হয়।

হঠাৎ করে এই বৈঠকের দিন এগিয়ে আনায় সচিবালয়সহ বিভিন্ন অঙ্গনে কৌতূহলের সৃষ্টি হয়। একটি সংবাদ মাধ্যম খবর দেয়, জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সব সচিবদের নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ভিন্ন আঙ্গিকে সচিব সভায় বসছেন। সাধারণত সচিব সভা বছরে এক-দুই বার হয়। অনেক সময় এই সভায় সরকার প্রধানও আমন্ত্রিত থাকেন। আলোচিত সেই সভার পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব মাহবুব তা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নবাণে পড়েন। তিনি প্রথমেই বলেন, বিশেষ কোনো মিটিং না। নিয়মিত যে মিটিং (প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির সভা) সেটিই হয়েছে। এটি মঙ্গলবার ছিল, ওই সময় আমার অন্য একটি প্রোগ্রাম আছে, সেজন্য আমি মিটিংটি এগিয়ে নিয়ে এসেছি। সোমবার সকালে সচিবালয়ে খবর ছড়িয়েছিল- মন্ত্রিসভা কক্ষে সচিব সভার পর প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির সভা হচ্ছে। আলাদা করে সচিব সভা হয়েছে কি না- এ প্রশ্নে মাহবুব বলেন, ‘না, না, না। আমাদের সাধারণ সভা হয়েছে।’ সভা শেষ হওয়ার আগে কয়েকজন সচিবকে মন্ত্রিসভা কক্ষ থেকে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়।

এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, এজেন্ডাভুক্ত আলোচনা শেষ হওয়ার পর কয়েকজন সচিব বের হয়ে যান।প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির সভায় যেসব সচিব অংশ নেন, তাদের বাইরেও অন্য সচিবদেরও এই সভায় যেতে দেখা গেছে। তা নিয়ে একজন সাংবাদিক মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও সে বিষয়টি এড়িয়ে যান তিনি।


আরও পড়ুন