ঢাকা মঙ্গলবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৩

বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিনের পথে


সিরাজুল ইসলাম photo সিরাজুল ইসলাম
প্রকাশিত: ১০-৬-২০২৩ বিকাল ৫:০

চরম ভোগান্তি শেষে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। তেলভিত্তিক কয়েকটি কেন্দ্র চালু হওয়ায় বেড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন। রাজধানীর অনেক এলাকায় দুইদিন ধরে লোডশেডিং হচ্ছে না। আবার অনেক স্থানে বিদ্যুৎ গেলেও ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে চলে আসছে। কয়েকশ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হওয়ায় গ্রামাঞ্চলেও পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। অনেক এলাকায় লোডশেডিং কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। এদিকে শুক্র, বৃহস্পতি ও বুধবার বৃষ্টি হওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদাও কিছুটা কমেছে। 

ন্যাশনাল লোড ডেসপাস সেন্টার বলছে, বৃহস্পতিবার রাত ৮টায় দেশের কোনও কোনও এলাকা লোডশেডিংয়ের আওতার বাইরে ছিল। এরমধ্যে ঢাকার দুই বিতরণ কোম্পানি কোনও লোডশেডিং করেনি। এছাড়া দেশের অন্যান্য এলাকাতেও বিদ্যুৎ পরিস্থিতির আশাব্যঞ্জক উন্নতি হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার পর্যন্ত অনেক এলাকাতেই বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক আছে।

রাজধানীর রামপুরায় থাকেন গৃহবধূ শরীফা সুলতানা। তিনি বলেন, বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত তার বাসায় লোডশেডিং হয়নি। এর আগে মঙ্গলবারও কয়েক দফা এক ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ ছিল না। বেসরকারি চাকরিজীবী রিচার্ড জুয়েল বাইন থাকেন যাত্রাবাড়ী এলাকায়। বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতির কথা জানান তিনি। বলেন, কয়েক দিন আগে ঘন ঘন বিদ্যুৎ যেত। বৃহস্পতিবার রাতে কয়েক মিনিটের জন্য বিদ্যুৎ গিয়েছিল। এরপর থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। আরেক বেসরকারি চাকরিজীবী আমিনুল ইসলাম বলেন, তার বাসা মিরপুর ১ নং এলাকায়। বুধবার রাত থেকে ওই এলাকায় লোডশেডিং হচ্ছে না। রাজধানীর চানখারপুলে থাকেন গণমাধ্যমকর্মী আব্দুল লতিফ রানা। তিনি বলেন, বুধবার রাত থেকে বিদ্যুৎ যাচ্ছে না। তবে দয়াগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা মিলি বাইন বলেন, তার এলাকায় বিদ্যুতের আসা-যাওয়া থামেনি। রাজধানী লাগোয়া কেরানীগঞ্জের বাসিন্দা ইউসুফ আলী বাচ্চু জানান, তার এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রয়েছে। ফকিরাপুলের বাসিন্দা মঞ্জুরুল আলম বলেন, বুধবার থেকে তার এলাকায় লোডশেডিং নেই।

জানা গেছে, সারা দেশে বৃহস্পতিবার রাত ৮টায় ৭৭২ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়েছে। এদিন বৃষ্টিতে ঢাকার তাপমাত্রা ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে এসেছে। গত কয়েক দিন ধরে যা ছিল ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি। এছাড়া দেশের তাপমাত্রাও বৃষ্টির কারণে অন্তত ৪ থেকে ৫ ডিগ্রি কমেছে। এতে বিদ্যুতের চাহিদা কমে গেছে। 
ন্যাশনাল লোড ডেসপাস সেন্টার বলছে, বৃহস্পতিবার রাত ৮টায় ঢাকায় ডেসকোর ১ হাজার ১৩০ মেগাওয়াট এবং ডিপিডিসির ১ হাজার ৫৬৪ মেগাওয়াট চাহিদার পুরোটাই সরবরাহ করা হয়েছে। ঢাকার আরইবি এলাকায় ২ হাজার ২৭৪ মেগাওয়াটের পুরোটাই সরবরাহ করা হয়েছে। এদিন চট্টগ্রামে পিডিবির চাহিদা ছিল ১ হাজার ৭৫ মেগাওয়াট এবং আরইবির চাহিদা ছিল ৪০৯ মেগাওয়াট। চাহিদার পুরোটাই সরবরাহ ছিল। কোথাও লোডশেডিং হয়নি। লোডশেডিংয়ের বাইরে ছিল খুলনা। ওয়েস্টজোন ৫৪৩ মেগাওয়াট এবং আরইবির ১ হাজার ৩৫১ মেগাওয়াট চাহিদার পুরোটা সরবরাহ করেছে।

বরিশালে লোডশেডিং ছিল মাত্র ২ মেগাওয়াট। বরিশালে ওয়েস্টজোনে ১৩১ চাহিদার পুরোটাই সরবরাহ করা হয়েছে। এছাড়া আরইবির ৩৬৬ মেগাওয়াট চাহিদার মধ্যে সরবরাহ করা হয়েছে ৩৬৪ মেগাওয়াট। কুমিল্লায় পিডিবির ৩২৪ এবং আরইবির ১০৭৮ মেগাওয়াটের পুরোটা সরবরাহ করা হয়েছে। ময়মনসিংহে পিডিবির ৬৬৭ মেগাওয়াটের মধ্যে ৪২৭ মেগাওয়াট সরবরাহ ছিল। লোডশেডিং হয়েছে ৪০ মেগাওয়াট। আরইবির ৯৯৪ মেগাওয়াটের স্থলে সরবরাহ হয়েছে ৭২১ মেগাওয়াট এবং লোডশেডিং ছিল ২৭৩ মেগাওয়াট। সিলেটে বিপিডিবির ১৯৯ মেগাওয়াটের স্থলে সরবরাহ ছিল ১৯০ মেগাওয়াট। মাত্র ৯ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল। অন্যদিকে আরইবির ১ হাজার ৩৫১ মেগাওয়াটের মধ্যে ১৩২৯ মেগাওয়াট সরবরাহ ছিল। লোডশেডিং ছিল ২২ মেগাওয়াট। রাজশাহীতে নেসকোর ৪৮৫ মেগাওয়াট চাহিদার ৪৫৫ মেগাওয়াট সরবরাহ করা হয়েছে। মাত্র ৩০ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। এছাড়া আরইবির ১১৭২ মেগাওয়াট চাহিদার মধ্যে ১০৪৫ মেগাওয়াট সরবরাহ করা হয়েছে। লোডশেডিং হয়েছে ১২৭ মেগাওয়াট। রংপুরে নেসকোর ৩৫১ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ২৯৫ মেগাওয়াট সরবরাহ করা হয়েছে। এছাড়া আরইবির ৭২৫ মেগাওয়াটের স্থলে ৫৫২ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়েছে।

বিপিডিবির মুখপাত্র মো. শামীম হাসান বলেন, তাপমাত্রা কমার সঙ্গে উৎপাদনও বেড়েছে। এতে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। কোনও কোনও এলাকায় লোডশেডিং হচ্ছে না।এদিকে মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, দেশব্যাপী চলমান বিদ্যুৎ সংকট এবং বেড়ে চলা মূল্যস্ফীতি গ্রহণযোগ্য নয়। সরকার স্বীকার করে- মূল্যস্ফীতির চাপ ও বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে মানুষ কষ্টে আছে। বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান এবং মূল্যস্ফীতি যাতে আর না বাড়ে, সে বিষয়ে কী ব্যবস্থা আছে তা খুঁজে বের করতে মন্ত্রী এবং কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক কৌশল খাটিয়ে দ্রুততম সময়ে এ দুই সংকট মোকাবিলারও পরামর্শ দেন তিনি।

জানা গেছে, কয়লার অভাবে ২৫ মে পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দ্বিতীয় ইউনিট বন্ধ হয় ৩ জুন। এরপর থেকে সারাদেশে ভয়াবহ লোডশেডিং শুরু হয়। এ নিয়ে কিছুটা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে সরকার। দেশের অন্যতম বড় দল বিএনপি লোডশেডিংয়ের বিরুদ্ধে কর্মসূচি দেয়। বৃহস্পতিবার তারা বিদ্যুৎ অফিসের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে। মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর উদ্যোগ নেয় সরকার। জুন মাসে বিপিডিবির চাহিদা অনুসারে জুন মাসের জন্য ৫৫ হাজার টন তেল সরবরাহ করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এরপরে উৎপাদনে যায় কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র। 

বুধবার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ঐতিহাসিক ছয় দফা দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগের আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, প্রচণ্ড গরমের মধ্যে লোডশেডিংয়ের কারণে মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। দুইদিনের মধ্যে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। ১০ থেকে ১৫ দিন পর দেশে আর বিদ্যুতের কষ্ট থাকবে না। এরমধ্যেই দেশে বিদ্যুতের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। 

জানা গেছে, দেশে মোট ১৫৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এরমধ্যে ৪৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতা নিয়ে চলছে। বাকি ১০৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৫৩টি রক্ষণাবেক্ষণ বা জ্বালানির অভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মূলত এ কারণে লোডশেডিং ভয়াবহ আকার ধারণ করে। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের মঙ্গলবারের তথ্য অনুযায়ী, ৫৩টি প্ল্যান্টের উৎপাদন সক্ষমতা ৪ হাজার ৯৩০ মেগাওয়াট। বাকি থাকে আরও ৫১টি প্ল্যান্ট। সেগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা ৭ হাজার ৮৫৫ মেগাওয়াট। কিন্তু, জ্বালানির অভাবে এগুলো ৩ হাজার ৫৬৮ মেগাওয়াট উৎপাদন করতে পারছে।

 

এমএসএম / এমএসএম