প্রাইম ফার্মাসিউটিক্যালস

নিষিদ্ধ ওষুধ বাজারে

news paper

ইউসুফ আলী বাচ্চু

প্রকাশিত: ২৩-৫-২০২৩ দুপুর ৩:৩৬

84Views

ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশান(ডব্লিউএইচও) এর নিয়মানুসারে গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস (জিএমপি) এর গাইডলাইন অনুসরণ না করায় মেসার্স প্রাইম ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডসহ বেশ কয়েকটি কোম্পানিকে ওষুধ উৎপাদন বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ওষুধ প্রশাসন। এরপরও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করছে প্রাইম ফার্মাসিউটিক্যালস। এই কোম্পানির ওষুধ ব্যবহারে হুমকির মুখে পড়ছে জনস্বাস্থ্য।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২১ সালের ২০ এপ্রিল ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশ অনুযায়ী, কারখানায় ওষুধ সামগ্রীর উৎপাদনের উপযুক্ত পরিবেশ না থাকায় প্রাইম ফার্মাসিউটিক্যালসের কারখানার সকল প্রকার ওষুধ তৈরি ও বাজারজাত নিষিদ্ধ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির বিষয়ে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের স্মারকনং-ডিএ/এমএল-৩১৩/৯৯/১৭৪৫ মোতাবেক সেফালোস্পোরিন জাতীয় পদ ব্যাতিত প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন লাইসেন্স (অজৈব-৪৫৪ ও জৈব-২২৫) এর আওতায় সকল প্রকার ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ সাময়িক বাতিল করা হয়। উক্ত অফিস আদেশে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মাহবুবুর রহমান ২০২১ সালের ২০ এপ্রিল স্বাক্ষর করেন। প্রাইম ফার্মাসিউটিক্যালসের বিরুদ্ধে ড্রাগ কোর্টে মামলা চলমান। ২০২১ সালে কোম্পানিটির কারখানায় শুল্ক গোয়েন্দা শাখা অভিযান পরিচালনা করে। এছাড়া প্রাইম ফার্মাসিউটিক্যালসের এর ম্যানুফ্যাকচার লাইসেন্স নবায়ন করা হয় নাই। এরপরেও ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওষুধের উৎপাদন তারিখ, ভিএআর নম্বর, ব্যাচ নম্বর ও মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ ব্যবহার করে ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করছে প্রতিষ্ঠানটি। 

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রাইম ফার্মাসিউটিক্যালস এর প্রধান কার্যালয়ে আছেন পরিচালক মো. আশরাফ হোসেন, সহকারী পরিচালক এটিএম গোলাম কিবরিয়া এবং গাজীপুরের স্থানীয় কর্মকর্তা রয়েছেন দুজন। একজন সহকারী পরিচালক মো. আহসান হাবীব অপরজন উপ-পরিচালক সফিকুর রহমান। সহকারী পরিচালক মো. আহসান হাবীব গাজীপুর জেলায় কর্মরত রয়েছেন ১৮ মাস যাবৎ এবং সফিকুর রহমান ৮ মাস হলো চট্টগ্রাম থেকে গাজীপুরে এসেছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের আনাচে-কানাচে প্রাইম ফার্মাসিউটিক্যালসের এর মতো ওষুধ কোম্পানির সংখ্যা কম নয়। তাহলে এই শ্রেণির কোম্পানির দেখভাল করছেন কোন সংস্থা?সরেজমিন গিয়ে জানা যায়, প্রাইম ফার্মাসিউটিক্যালসের কারখানা  গাজীপুরের টেপির বাড়ি শিশু পল্লী রোডে। উৎপাদন লাইসেন্স নম্বর জৈব-২২৫ এবং অজৈব-৪৫৪। পূর্বের অফিসের ঠিকানা বাড়ি নম্বর-৩৫, (দ্বিতীয় তলা) রোড নম্বর-৭ ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা, ঢাকা। বর্তমান অফিসের ঠিকানা: প্রাইম ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেড। হাউজ নং-১৭, রোডনং-৭১/ এ, ব্লক-ই, বনানী, ঢাকা-১২১৩। এই কোম্পানির মালিক মো: হালিম। তিনি বিদেশ থেকে বিভিন্ন প্রকার ওষুধ তৈরির র ম্যাটারিয়াল (কাঁচামাল) প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি আমদানি করে তা মিটফোর্টসহ বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানিতে সরবরাহ করে থাকেন। আবার অনেক সময় তিনি নিজেও মিটফোর্টে কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কাঁচামাল নিয়ে ফিনিস প্রডাক্ট সরবরাহ করেন।  তার কোম্পানির উৎপাদিত ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ মিটফোর্ড পাইকারী বাজারে  কম দামে বিক্রির কারণে সারাদেশে ওষুধের পাইকারি ও খুচরা বাজারে মুড়িমুড়কির মতো বিক্রি হচ্ছে।  এতে তার পকেট ভারি হলেও বিতর্কিত ও নিম্নমানের ওষুধ কিনে প্রতারিত হচ্ছেন জনগণ। 

প্রাইম ফার্মাসিউটিক্যালসের তৈরি পিয়ার-২০(ওমিপ্রাজল বিপি-২০ মি.গ্রা) নামক ১০০টির ১ বাক্স গ্যাস্টিক ক্যাপসুলের মূল্য মোড়কের গায়ে ৪৫০ টাকা মুদ্রিত আছে। অথচ ওই ১০০টির ১ বাক্স পিয়ার-২০ মিটফোর্ট পাইকারি বাজারসহ সারাদেশে পাইকারি ও খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৯০ টাকায়। তাহলে  ওষুধের  নির্ধারণ কমিটি কর্তৃক এসব কোম্পানির উৎপাদিত ওষুধের মূল্য নির্ধারণ করে কী লাভ? পিয়ার-২০ ক্যাপসুল এর ব্যাচ নম্বর-০০৬, ডিএআর নম্বর-৩১৩-২০-২৯, উৎপাদন তারিখ ফেব্রুয়ারি-২০২৩, মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ ফেব্রুয়ারি- ২০২৫।

এছাড়াও প্রাইমের ট্যাবলেট সেনক্যাল-ডি (ক্যালসিয়াম), নিউরো-পি (ভিটামিনবি১), ভিটামিন-বি৬, এবং ভিটামিন -বি১২) পিট্রোলাক (ক্যাটোরোলাক ট্রমিথামন-২০ মি.গ্রা), প্রিজিথ-৫০০ এমজি (এরিথ্রোমাইসিন-৫০০ মিগ্রা), প্রিডন-১০ (ডমপ্রিডন-১০ এমজি), জোকন ৫০ এমজি (ফ্লুকোনাজল-৫০ এমজি) ক্যাপসুল, প্রিটল -৫ এমজি (লিভোকট্রাইজিন-৫ এমজি) ট্যাবলেট, ডায়ালাক্স-৮০ এমজি (গ্লিক্লাজাইড-৮০এমজি) ট্যাবলেট, গ্রোফেনাক-১০০ এমজি (এসিক্লফেনাক বিপি-১০০ এমজি) ট্যাবলেট, প্যান্টাপ্রাজল পিপিএল-২০(প্যান্টাপ্রাজল বিপি-২০ এমজি) ট্যাবলেট এবং ডায়াফরমিন-৫০০ (ডায়াফরমিন এইচসিএল- ৫০০ এমজি) ট্যাবলেট। এসব ওষুধ মিটফোর্ট পাইকারি বাজারসহ সারাদেশের পাইকারী ও খুচরা বাজারে আন্ডার রেটে বিক্রি হচ্ছে। 

কোম্পানিটি ৪৫০ টাকার ওমিপ্রাজল-২০ (১ বাক্স ১০০ টি ক্যাপসুল) যদি ৯০ টাকায় বিক্রি করে তাহলে কি পরিমাণ কাস্টমসে ভ্যাট পরিশোধ করে? কারণ ৪৫০ টাকার ভ্যাট আসে ৬৭ টাকা ৫০ পয়সা ১০০টির এক বাক্স ওমিপ্রাজলের ৯০ টাকায় বিক্রি করলে (৯০.০০-৬৭.৫০)=২২.৫০ ওই হিসাবে প্রতি ১০০টির এক বাক্স ওমিপ্রাজল ক্যাপসুলের দাম পড়ে সাড়ে ২২ টাকা। তাহলে ১ কেজি ওমিপ্রাজলের কাঁচামালের দাম কত? আর ১ কেজি ওমিপ্রাজলে কত পিস ক্যাপসুল তৈরি করা হয়।

মিটফোর্টের একটি সূত্রের দাবি, আগে প্রাইম ফার্মাসিউটিক্যালসের ১০/১২ জন ব্যাবসায়ীক অংশীদার থাকলেও বর্তমানে টিকে আছেন একজন। বর্তমানে একমাত্র অংশীদার কোম্পানির লোকসান দেখাচ্ছেন তিনি। নতুন করে ব্যবসার জন্য অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব করলেও রহস্যজনক কারণে হালিম টাকা না নিয়ে নানাবিধ তালবাহানা করে মিটফোর্টে আন্ডার রেটে প্রতিমাসেই প্রায় ২ কোটি টাকার ওষুধ বিক্রি করছেন। এতে করে তার নিজস্ব আয় হচ্ছে প্রায় ৫০ লাখের মতো। 
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানার জন্য প্রাইম ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ওয়েবসাইটে দেওয়া মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করা হলে নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।


আরও পড়ুন