আলি কদরের হাতে বদলে গেছে পর্যটন করপোরেশন

news paper

ইউসুফ আলী বাচ্চু

প্রকাশিত: ৪-৪-২০২৩ দুপুর ৩:১৫

5Views

তৈরি পোশাক, চামড়া ও ওষুধ শিল্পের মতোই সম্ভাবনাময় খাত পর্যটন। এ খাতের পূর্ণ বিকাশে আসতে পারে লাখ লাখ মার্কিন ডলার। এ খাতকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে কাজ করছে পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. আলি কদর। তিনি যোগদানের পর অনেকটা প্রাণ ফিরে পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তার সময় পর্যটনের আমূল পরিবর্তন হয়েছে। বাড়ছে  জনপ্রিয়তা। কিন্তু চাকরির নিয়মানুসারে তার মেয়াদ শেষ পর্যায়ে। এ সপ্তাহে তিনি অবসরকালীন প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে (এলপিআর) যাচ্ছেন। কিন্তু তিনি ছুটিতে যেতে চান না। কাজ করতে চান পর্যটন বিকাশে। তাকে চেয়ারম্যান পদে চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। 

পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. আলি কদর বলেন, করোনাকালে সেবা খাতের সবচাইতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পর্যটন শিল্প। এই ক্ষত সবেমাত্র কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছে। তিনি এ খাতকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছেন। এখনো কিছু কাজ বাকি আছে। তিনি বাকি কাজটা শেষ করে যেতে চান। এ কারণে তিনি ছুটিতে যেতে চান না। চান কাজ করতে। 

আলি কদর বলেন, ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর এ খাতের জন্য অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে। ফলে মানসম্মত সেবা নিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে এ খাত। পর্যটন শিল্পের বিকাশে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ২০০৯-২০২২ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪৫০ কোটি ব্যয়ে ২৫টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। ফলে দিনাজপুর, কুয়াকাটা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, রংপুর, রাঙ্গামাটি, সিলেটের জাফলং ও লালাকাল এবং সুনামগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোণা, সিরাজগেঞ্জের কাজীপুর, গাজীপুরের সালনায় পর্যটন সুবিধাদি প্রবর্তন ও উন্নয়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি সংস্থার সকল ইউনিটস ডিজিটাল পদ্ধতির আওতায় আনা হয়েছে। সারা দেশে প্রায় অর্ধশত বাণিজ্যিক স্থাপনা প্রতিষ্ঠা করেছে এবং দেশি-বিদেশি পর্যটকদের নানা ধরনের সুবিধাদি (আবাসন, আহার, পরিবহন, প্যাকেজ ট্যুর ও গাইডিং, ডিউটি ফ্রি অপারেশন্স, পর্যটন আকর্ষণের উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ) যথাযথভাবে প্রদান করে আসছে।
পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. আলি কদর বলেন, প্রতিষ্ঠানটি এমন একটা যায়গা; এটার সবকিছু জানতেও এ বছর চলে যাবে। এরপর সবকিছু গুছিয়ে কাজ করতে অনেক বেগ পেতে হয়। এজন্য পর্যটন করপোরেশনের উন্নয়ন ব্যাহত হয়ে আসছে। তিনি বলেন, ২০৩০ সাল নাগাদ পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারীর ক্ষমতায়ন, যুবকদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জি.ডি.পির প্রবৃদ্ধিসহ আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন সাধিত হবে। সারাবিশ্বে পর্যটন এখন একটি একক বৃহত্তম শিল্প। সারাবিশ্বের মোট কর্মসংস্থানের প্রতি ১০ জনে ১ জন পর্যটন খাত থেকে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে প্রায় ৪৬ লাখ লোক জড়িত।

সরকারের পর্যটন শিল্পে গৃহীত বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দেশে প্রায় ১ কোটি লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে। জনগণকে সরাসরি সম্পৃক্তকরণের মাধ্যমে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন দেশের সার্বিক জনকল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। প্রথমত ‘পর্যটন শিল্প’ নিজেই একটি সেবাশিল্প। 

বাস্তবায়িত প্রকল্প: বর্তমান সরকারের আমলে যেসকল উল্লেখযোগ্য প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- সাগর কন্যা কুয়াকাটায় ১০ কোটি ৯৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে ৫৯ কক্ষ বিশিষ্ট আবাসিক এবং ২৫০ আসন বিশিষ্ট কনফারেন্স হল সুবিধাদি সম্বলিত পর্যটন মোটেল ও ইয়ুথ ইন নির্মাণ; কিশোরগঞ্জের মসুয়ায় সত্যজিত রায়ের জমিদার বাড়িতে ৫৯ লাখ ৫৮ হাজার টাকা ব্যয়ে জমিদারবাড়ি সংস্কার ও একটি রেস্ট হাউজ নির্মাণ; চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ এলাকায় ৬ কোটি ৩৫ লাখ ৯৯ হাজার টাকা ব্যয়ে ১৫টি আবাসিক কক্ষ, ৫০ শয্যা ডরমেটরি, ৫০ আসনের রেস্তোরাঁ ইত্যাদি সুবিধাদির সমন্বয়ে পর্যটন কমপ্লেক্স নির্মাণ; রাজশাহী পর্যটন মোটেলের ৪৫টি আবাসিক কক্ষ, ১০০ আসনের কনফারেন্স হল এবং ৫০ আসনের রেস্তোরাঁ ৩ কোটি ৯৪ লাখ ৮১ হাজার টাকা ব্যয়ে সংস্কার ও উন্নয়ন; রংপুর পর্যটন মোটেলের ৩৬টি আবাসিক কক্ষ, ১০০ আসনের কনফারেন্স হল এবং ১০০ আসনের রেস্তোরাঁ ৩ কোটি ৪৫ লাখ ৯ হাজার টাকা ব্যয়ে সংস্কার ও উন্নয়ন; দিনাজপুরে পর্যটন মোটেলের বিদ্যমান সুবিধাদির সাথে আরো ৬টি এসি কক্ষ ও ২০০ আসন কনফারেন্স হল ২ কোটি ২০ লাখ ৯৩ হাজার টাকা ব্যয়ে সংযোজন করে ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ; দিনাজপুরের কান্তজিউ মন্দিরের কাছে ২টি এসি বিশ্রাম কক্ষ এবং ৩০ আসনের রেস্তোরাঁ ৮০ লাখ ৯৭ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মাণ; সিলেটের জাফলংয়ে ২ কোটি ৯৭ রাখ ৭৭ হাজার টাকা ব্যয়ে ৪টি আবাসিক কক্ষ; ৫০ আসনের রেস্তোরাঁ এবং ২টি ওয়াস রুম সম্বলিত একটি মোটেল নির্মাণ; রাঙ্গামাটিতে ৯ কোটি ৭৪ লাখ ৮৮ হাজার টাকা ব্যয়ে ৪৮টি আবাসিক কক্ষ, ১০০ আসনের রেস্তোরাঁ সুবিধাদি সম্বলিত একটি নতুন পর্যটন মোটেল নির্মাণ; চট্টগ্রাম মোটেল সৈকতের স্থলে ৪ কোটি ৩০২ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৫৩টি আবাসিক কক্ষ, ১০০ আসনের রেস্তোরাঁ সম্বলিত একটি হোটেল নির্মাণ; আগারগাঁওয়ে শেরে-বাংলা নগরে ৭ কোটি ৯০১ লাখ পঁচিশ হাজার টাকা ব্যয়ে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের (বাপক) ১৩ তলা বিশিষ্ট ‘পর্যটন ভবন’ নির্মাণসহ নানান প্রকল্প। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের ফলে দেশি-বিদেশি পর্যটকগণের সারাদেশ ভ্রমণে আগ্রহ বেড়েছে এবং স্থানীয় শিক্ষিত বেকার যুবক ও যুব-মুহিলাদের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া, স্থানীয় জনগণের বিকল্প কর্মসংস্থান যেমন- স্যুভিনিয়ার শপ, স্যুটকি বিক্রেতা, স্থানীয় খাদ্য-সামগ্রী বিক্রেতা, হোটেল-মোটেলে পোল্ট্রি ও সবজি সরবরাহ ইত্যাদি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়াও ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে সমুদ্র কন্যা কুয়াকাটায় ওয়াচ টাওয়ার, পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীর সোনারচরে বিশেষ পর্যটন অঞ্চল গঠন, কুয়াকাটা, তালতলী ও পাথরঘাটা-কে নিয়ে বিশেষ পর্যটন অঞ্চল গঠন, ভোলার মনপুরা ও চর কুকরী-মুকরী, টাঙ্গুয়ার হাওর, সাতক্ষীরার মুন্সিগঞ্জ, পঞ্চগড়, নেত্রকোণার বিরিশিরি ও খালিয়াজুড়ি, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং বরগুনা জেলার তালতলীতে পর্যটন সুবিধাদি প্রবর্তনের লক্ষ্যে ১ কোটি ৯৯ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ব্যয়ে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়েছে।

চলমান প্রকল্প: চট্টগ্রামের আনোয়ারা পারকিতে ৬ কোটি ২১১ লাখ ৩৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৪টি কটেজ, ১০০ আসনের রেস্তোরাঁ, ৩০০ আসনের কনভেনশন হল, ১টি বার, ২টি পিকনিক শেড, ১টি সার্ভিস ব্লক, চেঞ্জিং ক্লোসেট, চিলড্রেন এ্যামিউজম্যান্ট, কার পার্কিং ও বাগান সম্বলিত স্থাপনা নির্মাণ কাজ চলছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে আনোয়ারা সমুদ্রসৈকত এলাকায় প্রাইভেট সেক্টরের উদ্যোগে পর্যটন শিল্পে বিনিয়োগ বাড়বে।

এখানে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় বেকার শিক্ষিত মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। নোয়াখালীর হাতিয়া ও নিঝুম দ্বীপে পর্যটন সুবিধাদির উন্নয়ন: নোয়াখালীর হাতিয়া ও নিঝুম দ্বীপে ৪ কোটি ৯৬১ লাখ ৭ হাজার টাকা ব্যয়ে পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণ কাজ চলছে। হাতিয়ায় কটেজ, রেস্তোরাঁ, শিশু পার্ক ও অন্যান্য সুবিধার স্থাপনা এবং নিঝুম দ্বীপে কটেজ, রেস্তোরাঁ, পিকনিক শেডসহ পর্যটন সুবিধাদি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

পঞ্চগড়ে পর্যটন সুবিধাদির উন্নয়ন: পঞ্চগড়ে ২ কোটি ২৪৬ লাখ ৭২ হাজার টাকা ব্যয়ে আবাসিক সুবিধা, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য সুবিধাদি সৃষ্টির প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। উল্লেখযোগ্য সুবিধাদি হচ্ছে ২টি কটেজ, ১টি মোটেল ও রেস্তোরাঁ ইত্যাদি। এগুলো নির্মাণের ফলে হাওরকেন্দ্রিক পর্যটন জনপ্রিয় হবে। হাওর অঞ্চলে দেশি-বিদেশি ইকোট্যুরিস্টদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে এবং স্থানীয় কর্মসংস্থনের সৃষ্টি হবে। অর্থবছরে বরিশালের দুর্গাসাগরে ১ কোটি ৬১৮ লাখ ১০ হাজার টাকা ব্যয়ে এক তলা বিশিষ্ট আবাসিক ভবন, রেস্তোরাঁ, স্যুভিনর শপ, ঘাটলা, ওয়াকওয়ে, সীমানা প্রাচীর, ডাক হাউস ও পিকনিক শেডসহ বিভিন্ন সুবিধা সৃষ্টির প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। নেত্রকোণার মোহনগঞ্জের আদর্শনগরে ৯ কোটি ৮৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা ব্যয়ে পর্যটন সুবিধাদি নির্মাণ প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে হাওর পর্যটনের উন্নয়ন হবে এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বর্তমান সরকার প্রণীত তথ্য অধিকার আইন সমুন্নত রেখে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন দেশি-বিদেশি পর্যটকদের পর্যটন সম্পর্কিত নানা প্রকার তথ্য সেবা দিয়ে যাচ্ছে। দেশের সব বিভাগের ‘পর্যটন আকর্ষণীয় স্থানসমূহ’ নিয়ে বিভাগ ভিত্তিক চিত্র ও তথ্য সম্বলিত ৮ বিভাগের সচিত্র পুস্তক প্রকাশ করা হয়েছে। একই সাথে সরকার ঘোষিত ডিজিটাল বাংলাদেশ স্লোগানকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন নিজস্ব ওয়েবসাইট তৈরি করেছে এবং সেটি নিয়মিত হালনাগাদ করা হচ্ছে। অন্যদিকে পর্যটন করপোরেশনের সকল বাণিজ্যিক স্থাপনা অনলাইন অটোমেশন পদ্ধতির আওতায় আনা হয়েছে। ফলে জনসেবা প্রদান অধিক দ্রুত ও সহজসাধ্য হয়েছে। দেশের পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন ও বিকাশের লক্ষ্যে যথাযথ প্রচার ও বিপণন কার্যক্রম অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন তার সেবামূলক কার্যক্রমসহ দেশের পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের নানাপ্রকার প্রচার কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। সমগ্র বাংলাদেশে ৮শ’র অধিক পর্যটন আকর্ষণ চিহ্নিত করে বিভাগওয়ারী ৮টি সচিত্র পর্যটন আকর্ষণ বই প্রকাশ করার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।


আরও পড়ুন